ঘড়ির আড়ালে ঘোড়েল।


বেশ কিছুদিন বাদে আবার আমার জীবনের একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলাম।আসলে নিজের শরীর নিয়ে ব্যস্ত এবং আতঙ্কিত থাকায় আজকাল আর লিখতেও মন সায় দেয় না।তবুও কিছুদিন আগে থেকেই ভাবছিলাম এই ঘটনাটা লিপিবদ্ধ করার কথা।এই ঘটনাটা বেশ কয়েকবছর আগের,যদ্দুর মনে পড়ে,এটা ২০১৫ বা ২০১৬ সাল নাগাদের ঘটনা।এই ঘটনার আগে আগেই আমরা বন্ধুরা সবার পরিবার মিলে গেছিলাম পুরী ঘুরতে।সেখানে এক সন্ধ্যায় কোনার্কের সূর্য মন্দির চত্বরেও ঘটেছিল এক অপার্থিব অনুভূতি।সেই ঘটনা অন্য আরেক সময়ে লিখবো।তো এই ঘটনার প্রেক্ষাপট কিন্তু আমাদের জলপাইগুড়ি শহরের বুকেই।যেহেতু আমার মনে হয় যে এই ঘটনার অন্তরালে রয়েছে কোনার্কের সেই সন্ধ্যার রেশ,তাই সেই ঘটনাটার উল্লেখ করে রাখলাম।বলাই বাহুল্য জলপাইগুড়ির ঘটনাটার নির্দিষ্ট সেই ঘড়ির দোকানের নাম আর স্থান আমি উল্লেখ করতে চাই না। কারন এসব ব্যাপার নিয়ে আমার সাথে অন্য কারো নাম জড়াক বা কেউ বিব্রত হোক সেটা আমি আদপেই চাই না।
সেই দিনের সন্ধ্যাটা ছিল বৃষ্টিমুখর,সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই আকাশ কালো করে এল,একটু পরেই শুরু হল আকাশভাঙা বৃষ্টি।আমি আর আমার এক বন্ধু সুদীপ্ত ঘটনাক্রমে গেছিলাম আমার রিষ্টওয়াচের ব্যাটারী পাল্টাতে,এই সুদীপ্তও আমাদের পুরী ট্রিপের অন্যতম সদস্য ছিল।সেখানে গিয়ে এই প্রকৃতির দূর্বিপাকে আটকে গেলাম।আমার সাথে পথ চলতি আরো কিছু ব্যক্তিও আটকে গেছিলেন বৃষ্টির দৌলতে,তাঁরাও এসে আশ্রয় নিলেন সেই দোকানের শেডের নীচে।জলপাইগুড়ি শহরে প্রত্যেকেই প্রায় প্রত্যেককে চেনেন।তাই গল্প  জমতে দেরী হল না।উপরি পাওনা হিসেবে জুটে গেল হকারের আদা-বীটনুন আর গোল মরিচ দেওয়া লাল চা।ব্যস,আমারও তারিনীখুড়োর মতো গল্পের নেশাটা চাগাড় দিয়ে উঠলো।একথা-সেকথার পর কথা প্রসঙ্গেই উঠলো আমাদের পুরী ঘুরতে যাওয়ার প্রসঙ্গ।আর সেই আঙ্গিকেই এল সেই কোনার্কের ঘটনার বিবরণ।আমি খেয়াল করে দেখেছি,আমার যত পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তিই হোন না কেন,সে তিনি আস্তিক হোন বা নাস্তিক,আমার জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো কেউ কখনো উড়িয়ে দেন নি বা দিতে পারেনও নি।এক্ষেত্রে আমার বাবার অতীতের কার্য কলাপ হয়তো কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে থাকবে,কারন জলপাইগুড়ির পুরোনো বাসিন্দাদের বেশীর ভাগ ব্যক্তিই বাবাকে সম্যকভাবে চিনতেন এবং বাবার কর্মকান্ড সম্পর্কে জানতেন।যাই হোক,এবার আসল ঘটনায় আসি।কোনার্কের ঘটনা নিয়ে কথা বলছি,আশে-পাশের সবাই বেশ মনোযোগ দিয়েই শুনছিলেন,আমিও একদম ঘটনাটার মধ্যে ঢুকে গেছিলাম বলতে-বলতে,হঠাৎ করেই ঝড়াৎ করে আওয়াজ করে লোডশেডিং হয়ে গেল।দেখলাম রাস্তার ওপারেই লাইন আছে,এদিকের ফেজটাই গেছে।জলশহরের এ এক বিরাট দূর্নামের জায়গা। একটু হাওয়া দিলেই বা একটু বৃষ্টি হলেই লোডশেডিং হয়ে যায়,আর সবুজে ঘেরা শহরে গাছ পড়ে ইলেক্ট্রিকের তার ছিঁড়ে পড়াটাও বর্ষার রোজনামচা। ঘড়ির দোকানের মালিক প্রায় সাথে-সাথেই একটি জাম্বো সাইজের মোম জ্বালিয়ে কাউন্টারে সেঁটে দিলেন।তিরতিরে আলোর শিখায় স্তব্ধ ঘড়ির কাঁটাগুলোর প্রতিচ্ছবি বিরাট আকার সাদা দেওয়ালে এক অস্বস্তিকর অনুভব এনে  দিচ্ছিল।অকস্মাৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়াতে আমাদের গল্পেও একটু ছেদ পড়েছিল।তার মধ্যেই দু-একজন একটু ধূমপানের বন্দোবস্ত করে নিলেন সেই ফাঁকে।হঠাৎ করেই সুদীপ্ত দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে একটা  আওয়াজ করে আমার টি-শার্ট ধরে একটা টান দিল।আমি প্রথমেই ওর দিকে তাকিয়ে তারপরে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেওয়ালের দিকে তাকালাম।প্রথম নজরে কিছুই মালুম করতে পারলাম না।আমার আশে-পাশের সবাই আগের মতোই নির্লিপ্ত।সুদীপ্তর মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।সুদীপ্ত আমাকে টেনে একপাশে ডেকে উত্তেজিত স্বরে বললো,সব চাইতে বড় ঘড়িটার দিকে দেখেছিস? আমি আবার সেখান থেকেই বিশালাকার অজন্তার ঘড়িটা দেখার চেষ্টা করলাম,কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না।আমার মনে তাৎক্ষণিক ভাবে এই ধারণা এসেছিল যে নিশ্চয়ই আলো-আঁধারির খেলায় ঘড়িগুলোর রিফ্লেকশানে ও কিছু ভুলভাল ভেবে ভয় পাচ্ছে।এরপরে সুদীপ্ত আমাকে টেনে সেই দোকানের অপর প্রান্তের ব্যালকনিতে টেনে নিয়ে গেল,ঘড়িটার ঠিক নীচে।এবার খেয়াল করে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম আমি।ঘড়িটার বিশাল ডায়ালটার মাঝখানে এক যন্ত্রণাক্লিষ্ট অব্যক্ত মুখচ্ছবি ফুটে উঠেছে! ঠিক যেন বালির তৈরী একটা থ্রি ডি ইমেজ! একদম "মমি" সিনেমার মতো! সেই মুখটা চীৎকার করে যেন আমাদের সাবধান করতে চাইছে।ঘৃণায় তার চোখদুটো ফেটে পড়ছে।চোখের জায়গায় আছে দুটো নিখাদ গহ্বর,সেই গহ্বর থেকে যেন ঠিকরে  বেরোচ্ছে ক্রোধাগ্নি,ঘৃণা! মুখব্যদান করে আছে সেই মুখমণ্ডলটা!কী বীভৎস সেই ছবি! অসীম  সাহসে পকেট থেকে বের করে ফেললাম আমার সেই সময়ের কেনা জোলো ফোনটা আর তুলে ফেললাম সেই ভয়ঙ্কর মুখাবয়বের ছবি।আমি যেন যন্ত্রচালিত হয়ে করে ফেললাম কাজটা।ত্রিশ থেকে চল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে গেল সেই ছবি,আমাদের দুইজোড়া বিস্ফারিত চোখের সামনেই!অবাক ব্যাপার হল আমি উপলব্ধি করলাম যে আমি আর সুদীপ্ত ছাড়া আর কেউই এই ব্যাপারটা খেয়াল করেনি বা কেউই এই মুখাবয়ব দেখতেই পারছে না আমরা দুজন ছাড়া।চটজলদি আমি আর সুদীপ্ত ব্যাপারটা ওখানেই চেপে গেলাম  কারন এই মুখমন্ডলের সাথে আমরা পূর্ব পরিচিত।এই সেই মুখ যেটা আমরা কোনার্কের সেই ঘটনায় দেখেছিলাম।এমন সময়েই হঠাৎ করে আবার ইলিক্ট্রিসিটি চলে এল।খেয়াল করে দেখলাম বৃষ্টিটাও একটু ধরে এসেছে।আমি আর সুদীপ্ত ওখান থেকে বেরিয়ে যাই কালবিলম্ব না করে।
অনেক ভেবে এবং প্রচুর আলোচনা করেও কোনোভাবেই ব্যাপারটা জাস্টিফাই করতে পারিনি সেদিন এবং তার পরেও কোনো দিন।
জানি এই ঘটনাটা আগের ঘটনাগুলোর মতো নয়,বেশ অদ্ভুত এবং আমাদের নিজেদের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল কিন্তু পরবর্তীতে সেই ছবিখানি কিন্তু আমার মোবাইলে রয়ে গেছিল এবং আমার স্ত্রী এবং ঘনিষ্ট মহলের অনেকেই সেই ভয়াবহ ছবিখানা দেখেছে।কাকতালীয়ভাবে ছবিটা তোলার পরদিন থেকেই আমার বেশ কিছুদিন বেদম জ্বর আসে এবং কিছুদিনের মাথায় আমার মোবাইলটিও আকস্মিকভাবে খারাপ হয়ে যায়,বিভিন্ন দোকানে দেখিয়ে জানতে পারি যে মোবাইলটির বোর্ড খারাপ হয়ে গেছে এবং সেটি নাকি পাওয়াও যায় না।যদিও মেরুন কালারের সেই ফোনটি এখনো আমার কাছে সযত্নে রক্ষিত আছে যদি কোনোদিন সেটা ঠিক হয় তবে সেই ছবিটা আমি নিশ্চয়ই প্রকাশ করবো।কারন ছবিটা কিন্তু আমার মোবাইল থেকে ডিলিট হয়ে যায়নি।

©Anirban Banerjee

Comments

  1. Darun laglo..konarak er obhigyota ta porei soja ekhane elam eta porar janna.

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুরুদেব।

রাজ।

শেষ লেখা।