কোনার্কের কোণে।

 

।। কোনার্কের কোণে ।।

জীবনের প্রথম পুরী ভ্রমনের স্মৃতি তিন বছর বয়সের।তারপরে আরো দুইবার যাওয়া হয়েছিল জগন্নাথের ধামে,কিন্তু সেই দুইবারই ২০১৬ থেকে ১৯ এর মধ্যে। এই ঘটনাটি ঘটেছিল আপাতঃ শেষবারের ভ্রমণকালে।
পাহাড়-সমুদ্র আর জঙ্গলের মধ্যে চিরকালই পাহাড় আমার খুব প্রিয়।সেই কারনে পাহাড় ভ্রমণের আধিক্যই আমার জীবনে বেশী।তবু বন্ধু-বান্ধবের এবং সব চাইতে বড় কথা,গৃহ-মন্ত্রীর জোরাজুরিতেই বাধ্য হয়ে তৃতীয়বারের পুরী ভ্রমণের পরিকল্পনা পাস করতে হল এক সান্ধ্যকালীন বৈঠকে।আমাদের গ্রুপের প্রত্যেকের জীবনেই একটা জিনিস কমন,সেটা হল "উঠলো বাই তো কটক যাই!" সেই প্রবাদকে সার্থকতা দিতে পরদিনই সকাল ১১-৩০ মিনিটের মধ্যে বেগুনটারীর ভাই তথা বন্ধুসম পঙ্কজ সারাওগীর ই-টিকিটের অফিসে হানা এবং সু্যোগ পেয়ে বেশ কয়েক কাপ চা উদরস্থ করার পর,মাছ বাজারের অপবাদকেও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার মতো দরদামের পরে দুরন্ত এক্সপ্রেসে টিকিট কেটে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ঘরে প্রত্যাবর্তন।
এর পরের ঘটনাও আর পাঁচটা বাঙালী পরিবারের গড়পড়তা ঘটনার মতোই।প্রতিবার বাইরে যাওয়ার আগেই কমপক্ষে সাত-আটদিন আগের থেকেই শুরু সেই ঘোরার প্ল্যান-প্রোগ্রাম নিয়ে আলোচনা সভা!তেলেভাজা-চায়ের শ্রাদ্ধ।আর শপিং মলে যাওয়ার জন্য ঘ্যানঘ্যানানি! কারন প্রতিবারের মত এইবারেও নাকি বাইরে গিয়ে পরবার মতো জামা-কাপড়-জুতো নেই।বুঝি না,প্রতিবার বাইরে থেকে ফেরার পর কোন যাদুবলে সেই ট্রিপের জামা-কাপড়-জুতোগুলো অস্পৃশ্য বা অদৃশ্য হয়! এও এক ভৌতিক রহস্য।
যাই হোক,এত কিছু প্রাক-যুদ্ধকালীন তৎপরতা এবং প্রস্তুতির পরে অবশেষে আমরা রওনা হই।গিয়ে পৌঁছই এবং সব কিছু পরিকল্পনা মাফিকই চলতে থাকে। অপরিকল্পিত ঘটনাটি ঘটে সাইট সিয়িং-এর শেষ দিনে।যদিও পুরীর সব জায়গাই আগেই আমাদের ঘোরা,তবুও সাইট সিয়িং প্রতিবারই করা হয়, এটা একটা রুটিনের মত ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গেছে।শুধু পুরী বলে নয়! দার্জিলিঙ,সিকিম এসব জায়গায় আমরা সাত-আটবার করে গেলেও সাইট সিয়িং কিন্তু পুরোনো হয় না কখনোই।বরং প্রতিবার গিয়ে খুঁজে পাই কিছু না কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য! সে যাই হোক,কোনার্কের এই বৈশিষ্ট্য আবিষ্কৃত না হলে আমরা বোধ হয় খুশীই হতাম।
সেদিন পুরী ভ্রমনের শেষের দিন নন্দনকাননে ঢুঁ মেরে আমরা যখন কোনার্কে পৌঁছলাম তখন আধো আধো তরল অন্ধকারে ছাইতে শুরু করেছে চারপাশ।আমার জীবনে দুই জায়গায় গিয়ে আমার শরীর ভারী হয়ে গেছিল এবং এখনো হয়।এক হচ্ছে মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারীর নবাব সিরাজদৌল্লার সভাকক্ষ আর আরেকটি হল কোনার্কের সূর্য মন্দির! এই দুই জায়গায় পা দিলেই এক অতিপ্রাকৃত অনুভব সব সময় হয় মনের ভেতর। তোলপাড় হতে থাকে মাথার ভেতরে। আমি যেন চোখের সামনে দেখতে পাই সেই যুগের সব দৃশ্যপট! লিখে বা মুখে বলে বোঝানো অসম্ভব সেই উপলব্ধি!অনেক ঐতিহাসিক জায়গায় গেছি,কিন্তু এরকম অনুভূতি কোথাও হয় না।যাই হোক,আর গৌড়চন্দ্রিকা না করে এইবার আসল ঘটনায় আসি।কোনার্কের আনাচে-কানাচে ঘোরাঘুরি করতে করতেই পেয়ে গেলাম ছিপছিপে গড়নের স্নেহাশীষ মোহান্তিকে।উপযাচক হয়ে তিনি নিজেই এসে আলাপ বাঁধলেন আমার সাথে।নাম শুনে কৌতুকবশে জিজ্ঞেস করলাম প্রাক্তন ভারতীয় মিডিয়াম পেসার দেবাশীষ মোহান্তির কেউ হন কিনা উনি।হাসি-ঠাট্টায় বুঝলাম ইয়াং শিক্ষিত ছেলেটি গাইডের পেশায় নিযুক্ত।মনের  মিল খুঁজে পেয়ে সানন্দে বরণ করে নিলাম আমাদের দলে।স্নেহাশীষের মুখ থেকে আধা বাংলা,আধা ইংরাজী,হিন্দীতে ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম সব ইতিহাস আর ফিরে যাচ্ছিলাম সেইসব সোনালী অতীতের মূর্চ্ছনায়।ধীরে ধীরে অন্ধকার জমাট বেঁধে ঘনিয়ে আসতে লাগলো চারপাশে।হলুদ ঝাপসা সোডিয়াম ভ্যাপারের মায়াবী আলোতে অষ্পস্ট মায়াবী রুপে দাঁড়িয়ে সূর্য মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ! কথা বলতে বলতে আমি আর স্নেহ এগিয়ে গেছিলাম আলাদাভাবে।আমার অন্য বন্ধুদের কোনোকালেই কোনো ঐতিহাসিক অনুভব আসে না আর তারা এসবে আকর্ষণ বোধও করে না।সাইট সিয়িং তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য।তাও তাদের মধ্যে সুদীপ্ত আমার পাল্লায় পড়ে কিছুটা দলে ভিড়েছিল।এমন সময়ে সুদীপ্তই এসে খবর দিল মহিলা সদস্যারা ফিরতে চাইছেন হোটেলে।সারাদিন ধকলের পরে এসব ইতিহাসের কচকচানি আর তাদের ধাতে সইছে না। পত্নীর ইচ্ছায় কর্ম! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে ছ'টা বাজে।অগত্যা গুটিগুটি পায়ে হাঁটা দিলাম এক্সিট পয়েন্টের দিকে।কোনার্ক ছাড়ার আগে সবার কিছুটা হাল্কা হওয়ার প্রয়োজন হল।মূল ফটকের ঠিক পাশে বিরাট ঝাঁকড়া এক গাছ! এতোটাই বড় সেই গাছ যে তার আশেপাশের বেশ কিছুটা জায়গায় আলোও প্রবেশ করতে পারছে না।বেশ নিরিবিলি, প্রায়-অন্ধকার এক ছমছমে জায়গা।স্নেহ জানালো সেইদিকেই পুরুষ-মহিলা আলাদা আলাদা ভাবে হাল্কা হওয়ার পাকাপাকি ব্যবস্থা।ধাপে-ধাপে মহিলাদের পাঠানোর ব্যবস্থা হল প্রথমে।আমি আর সুদীপ্ত বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পাহাড়ায় রইলাম।বেশ ঝিরঝিরে হাওয়া বইছিল।ফট করে হঠাৎই কেমন যেন গুমোট,দমবন্ধ একটা থমথমে পরিস্থিতি সৃষ্টি হল।পরিস্থিতি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এতোটাই পরিবর্তন হয়ে গেল যে আমরা প্রবলভাবে সেটা অনুভব করতে পারছিলাম।জীবনের বেশ কিছু ভৌতিক এবং আধিভৌতিক অভিজ্ঞতা থাকার কারনে মনে একটা কু ডাকলো।কিন্তু বাড়ী থেকে এতদূরে,অন্য রাজ্যে সেসব কিছু হবে না ভেবে সেসব ভাবনা নিমেষেই ফুৎকারে উড়িয়ে দিলাম মনেই।কিন্তু তাও শরীরটা ভারী ভারী লাগতে লাগলো।এই লক্ষন আমার চেনা!সুদীপ্তর দিকে তাকিয়ে দেখি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক চাইছে! বুঝলাম বেচারা চূড়ান্ত অস্বস্তিতে আছে।বেশ কিছুটা দূরে দেখছি অন্য বন্ধুরা দাঁড়িয়ে স্নেহকে চাটার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বাকি পাঁচ ইন্দ্রিয়কে ততক্ষণে সজাগ করে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।আমাদের বন্ধুদের মধ্যে গালি-গালাজে আমি আর সুদীপ্তই সব চাইতে বেশী ইনোভেটিভ আর শিক্ষিত।হঠাৎ সুদীপ্ত আমার কোমরে কনুই দিয়ে একটা খোঁচা মারায় কঁক করে উঠলাম।তাকিয়ে দেখি ওর চোখ গাছটার ওপর দিকে।সুদীপ্ত ফিসফিস করে "আররে বানচো" বলে আর কথাটা শেষ করতে পারলো না।একসাথে দুজনে দেখলাম সেই গাঢ় অন্ধকারের মধ্যেও তার থেকেও গাঢ় আরেকটা অন্ধকার দলা! ঠিক যেন নিকষ কোনো অন্ধকারের একটা রুপপ্রাপ্ত অবয়ব।বলে বা ভাষায় সেটা প্রকাশ করা অসম্ভব!!"মমি" সিনেমায় যেমন ধোঁয়া দিয়ে তৈরী একটা  মুখাবয়ব দেখিয়েছিলো,অনেকটা ঠিক সেরকম!
দুজনেই পাথরের মত স্থির হয়ে রইলাম,সব বুঝতে পারছি,জ্ঞান টনটন করছে,কিন্তু শরীরটা মনে হচ্ছে চুম্বক দিয়ে কেউ সেঁটে দিয়েছে মাটির সাথে! হাজার কেজির বাটখারা দিয়ে যেন বেঁধে দিয়েছে পা-জোড়া! দেখলাম সেই জমাট বাঁধা অন্ধকারটা ধীরে ধীরে একটা অবয়ব নিচ্ছে।আমাদের দুইজোড়া চোখের সামনে সেটা একটা কিম্ভুত মুখোসের আকার ধারণ করলো।চোখ দুটোর জায়গায় যেন অতল দুই গহন গহ্বর! মুখের জায়গায় যেন আমরা দুজনেই সেঁধিয়ে যাবো! অজগরের মুখের মত যেন গিলে খাবে আমাদের।সব বুঝছি,কিন্তু তাও চোখ সরাতে পারছি না,কি এক সম্মোহনে দৃষ্টি আটকে আছে ওই রাক্ষুসে মুখটার মধ্যেই।ধীরে ধীরে সেই মুখোসের মত আকারটা যেন তীব্র জিঘাংসায় ফেটে পড়ছে।আকারে বাড়ছে! মনের ভুল কিনা জানি না,কেন জানি মনে হল চারদিকের সব আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে গেছে আর ওই মুখটার থেকে শনশনে হাওয়ার মত এক সুতীক্ষ্ণ অথচ চাপা হিসহিস শব্দ ভেসে আসছে।অব্যক্ত কোনো উচ্চারণে কিছু যেন বলতে চাইছে।রাগে,ঘৃণায় সেই ভয়ঙ্কর মুখটা যেন ফেটে পড়তে চাইছে।হঠাৎ নারীকন্ঠের কলতানে আমাদের চটকা ভেঙে গেল।নিমেষের মধ্যে মিলিয়ে গেল সব ধোঁয়াসা।দেখি দূর থেকে আমাদের মহিলাবর্গ আসছে।হতভম্ব আমরা! চারপাশে তাকিয়ে দেখি সবকিছুই স্বাভাবিক! কোথাও কিছুই নেই।দূরে বন্ধুরা গল্পগুজব করছে।আমরা দুজনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে ছ"টাই  বাজে তখনো!!কি আশ্চর্য! আমি কোনোভাবেই হিসেব মেলাতে পারলাম না।হাত বাড়িয়ে সুদীপ্তের মাথায় ঠাস করে মারলাম এক চাঁটি।তার উত্তরে সুদীপ্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া আর শুদ্ধ বচনে বুঝলাম যে আমি স্বপ্ন দেখছি না।দুজনেই ফ্যালফ্যাল করে হাবার মত দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। যন্ত্রচালিতের মত সবার পিছু পিছু গাড়ীতে উঠলাম,হোটেলে ফিরলাম।রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর কিছুটা ধাতস্ত হয়ে দুজনে শলা করে ভিজিটিং কার্ড থেকে নাম্বার নিয়ে ফোন লাগালাম স্নেহাশীষকে।যাবতীয় খুলে জানালাম তাকে।সে জানালো তার প্রোফেশনাল এবং নন-প্রোফেশনাল জীবনে এরকম কোনো ঘটনা শোনেনি এবং দেখেওনি।এরপরে আর কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না।একটাই ভরসা ছিল যে এই অভিজ্ঞতা আমার একার জীবনে ঘটেনি,তাহলে হয়তো নিজেকেই নিজে অবিশ্বাস করতাম,এই ঘটনার অনেকদিন পর বাড়ী ফিরে আমি আর সুদীপ্ত ঘটনাটা সবাইকে বলেছিলাম।আমাদের পরিচিতরা,আগে যারা ঘুরতে গেছিল বা পরেও গেছিল,তাদের সাথে যোগা্যোগ করে জানার চেষ্টা করেছিলাম তাদের সাথেও এরকম কিছু ঘটেছিল কি না,কিন্তু সেগুড়ে বালি।যাই হোক আমরাও এই ঘটনার কথা ভুলেই গেছিলাম।যদি না আমার আর সুদীপ্তের সাথেই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আবার না হত।সেই ঘটনা আমার "ঘড়ির আড়ালে ঘোড়েল" কাহিনীতে আছে।

-অনির্বাণ ব্যানার্জী।©

Comments

Popular posts from this blog

গুরুদেব।

রাজ।

শেষ লেখা।