জলশহরের আলেয়া।।


প্রথমেই আপনাদের জানিয়ে রাখি,আজ যে ঘটনাটা লিখতে চলেছি সেটি আমার নিজের শহরের অর্থাৎ জলপাইগুড়ির বুকেই আমার সাথে ঘটেছিল।আমার জীবনে ঘটা আগের যে তিনখানা ভয়ঙ্কর এবং মজার ঘটনাগুলো লিখেছিলাম,এই ঘটনা তার থেকে অনেকটাই আলাদা।অন্ততঃ আমার ক্ষেত্রে এই ঘটনাটির আলাদা একটি স্থান সব সময়েই থেকে যাবে কারন এই ঘটনাটির আগে আরো অন্যান্য অনেক ঘটনা ঘটে গেলেও এই অভিজ্ঞতার সময় আমি একটু ভয় পেয়েছিলাম।যদিও ভয়টা তখন ছিল না,ভয়টা এসেছিল বেশ কিছুদিন বাদে এবং তা বেশ কিছুদিনের জন্য আমার মনে গেঁথে বসেছিল।কিন্তু আজ এই ঘটনাটা লিখতে গিয়ে প্রথমেই আরো যে ব্যাপারটা আপনাদের জানানো প্রয়োজন সেটা হল,আমার সাথে সেদিন যে তিন জন বন্ধু উপস্থিত ছিলো,তাদের প্রত্যেকেরই আপত্তি আছে নিজেদের নাম প্রকাশ করাতে,সেই জন্য আমার নিজের পরিচয় এবং স্থান,কাল সব এক রেখেও আমাকে আমার ওই তিন বন্ধুর নাম পরিবর্তন করতে হচ্ছে।আশা করি এটুকু খুঁত আপনারা মার্জনা করে দেবেন।
আমি যে সময়কার কথা বলছি,সেটা ২০০৭ সাল।২০০৬ সাল থেকে জলপাইগুড়ির বেগুনটারীতে আমার কম্পিউটারের দোকান। তখনো আমি ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে শুরু করিনি।কিন্তু আমার তখনকার এক অন্যতম প্রিয় বন্ধু ছিল এক ফটোগ্রাফার,ধরা যাক তার নাম বিধান।আমার তখন বাইকও ছিল না।বিধান রোজ দু-বেলা করে আমার দোকানে আসতো।আমার দূরে কোনো কম্পিউটার রিপেয়ারিং,সাপ্লাই,সেল এসব থাকলে আমি ওর বাইকেই ওর সাথেই সেসব কাজ সারতে যেতাম।ও-ও সেইসব ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে আমাকে সাহায্য করতো। ও একটু এঁচোড়ে পক্ক হওয়ার দরুন তার কিছু বছর আগেই ও ওর জীবনের সব চাইতে বড় কাজটি সেরে ফেলেছিল।বিয়ে! আর সে কারণে ওর স্ত্রী-ও মাঝে-মাঝেই ওর সাথে আমার দোকানে আসতো।
আমরা সেই তিন-চার বন্ধুরা বেশীর ভাগ রবিবারেই বা কখনো কোনো স্ট্রাইক হলেই বেরিয়ে পড়তাম অজানার উদ্দেশ্যে।আমি বাদে ওদের সবারই বাইক বা স্কুটি ছিল,তাই কখনোকোনো অসুবিধে হত না।যেহেতু আমাদের সেই গ্রুপের প্রত্যেকেই ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলাম তাই অন্যান্য সরকারী ছুটির দিনগুলো আমাদের কাছে আলাদাভাবে কোনো অর্থ বহন করতো না।

আমাদের গ্রুপের মধ্যে সব চাইতে বেশী বন্ডিং ছিল আমার আর বিধানের মধ্যে।হয়তো ফটোগ্রাফি আর ওয়াইল্ড লাইফের প্রতি দুজনের প্রচন্ড টানটাই সেক্ষেত্রে কাজ করতো।আর আমাদের তখনকার একটা অঘোষিত আড্ডাখানা ছিল,সেটা হল আমাদের জল শহরের শেষপ্রান্তে অবস্থিত "তিস্তা পর্যটক আবাস"। আমাদের কড়া নিয়ম ছিল প্রতি রবিবার সন্ধ্যা ছয়টায় আমরা সবাই সেখানে উপস্থিত হব,সেটা ছিল একেবারে বাধ্যতামূলক।সেখানে রাত ৯-৩০ বা ১০ টা অবধি চলতো আমাদের সান্ধ্য আড্ডা,কখনো আমাদের এন-জি-ও-র মিটিং।সাথে থাকতো রাউন্ডের পর রাউন্ড চা আর বেশীর ভাগ দিনই হয় প্লেটের পর প্লেট ভেজ পকৌড়া আর নয়তো ফ্রেঞ্চ ফিঙ্গার। সেই আমলে ১৫/- প্রতি কাপ চা খাওয়াটা যথেষ্ট বিলাসিতা হলেও আমাদের একপ্রকার রাজ চলতো সেখানে।আর ওখানকার তৎকালীন স্টাফ যাঁরা ছিলেন তাঁদের ব্যবহারও ছিল খুব ভালো।এমনকি কখনো খুব ভীড় থাকলে ওঁনারাই তাড়াহুড়ো করে আমাদের বসার ব্যবস্থা করে দিতেন,এমনকি একবার কনফারেন্স রুমেও আমরা আমাদের চায়ের আড্ডা বসিয়েছিলাম।আমরা কোনো সপ্তাহে না গেলে ওঁনারাও বিমর্ষ হতেন।  আর এই সাপ্তাহিক আড্ডার বাইরেও আমি আর বিমান সপ্তাহে অন্ততঃ দুই-তিনদিন রাতে আমার দোকান বন্ধের পর মাষকলাই বাড়ি,শান্তিপাড়া,রাজবাড়ি পাড়া চক্কর কেটে গিয়ে পৌঁছতাম " তিস্তা পর্যটক"।আমাদের দুজনের চিরকালই খুব পছন্দের ছিল ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন।আর তিস্তায় এই দুইটি আইটেম বানাতোও জম্পেশ।কিন্তু ট্যাঁকে জোর না থাকায় আমরা এক প্লেট ফ্রায়েড রাইস আর এক প্লেট চিলি চিকেন নিতাম আর সাথে একটা ফাঁকা প্লেট নিতাম।তারপরে দুজন ভাগ করে খেতাম।এতে কিছু লাভও ছিল!প্রথমতঃ দুজনেরই কিছুটা টাকা বাঁচতো আর দ্বিতীয়তঃ বাড়ি ফিরে একটু লেট নাইটে ডিনারটাও সারা যেত,নইলে বাড়িতে হাজার প্রশ্ন আর অশান্তির ঝড় বয়ে যেত।

আমাদের শীতের রাতে ঘন কুয়াশায় বাইক চালিয়ে ঘোরারও একটা অদম্য নেশা ছিল।তেমনই সেবার, সেই ২০০৭ সালের শীতেও সেই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। আমি যখন দোকান বন্ধ করে প্যাসেজে এসে দাঁড়ালাম তখন রাত প্রায় ৯-৩০।দেখলাম উল্টোদিকের তৎকালীন WBSEB এর অফিসটিও ধোঁয়াসে হয়ে আছে,আর পেঁজা মেঘের মতো কনকনে কুয়াশা হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে।রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা।শুধু আমার দোকানের বাইরে আমাদের বেগুনটারী এলাকারই "শ্যাম দা" তার ব্রেড চপ আর পাওভাজির পসরা নিয়ে বসে আছে,সেখানে কিছু ভীড় আছে বটে,তবে সে সবই স্থানীয় "রাতজাগা" লোকের দল।
সেই আবহাওয়ার ঝলক দেখে আমার মন নেচে উঠলো,সাথে সাথেই ফোন করলাম বিধানকে।আমার ফোন রিসিভ করেই ওর প্রথম কথা হল,"রাস্তাতেই আছি ভাই,আসছি।তুই থাকিস"।এই বলে ফোনটা কেটে দিল।
আমি চোখ বুজে মুখে-চোখে ভেজা কুয়াশার আমেজ নিতে নিতে একটা গোল্ড ফ্লেক ধরালাম।চার টান দিতে দিতেই বিধান এসে হাজির।ও চিরকালই ছিল তুমুল হুজুগে,একদম আমার মতো।এসেই চীৎকার,চ্যাঁচামেচি করে পুরো শোরগোল তুলে দিল।তারপর দেখলাম ও একা আসেনি।ওর সাথে আরেকটা বাইকে আরো দুজন এসেছে।পরিচয়পর্ব সমাধা হল,জানতে পারলাম তারা দুজন হল বিধানের পুরোনো স্কুলের বন্ধু,এই শহরেরই।দেখলাম দুজনেই আমাকে চেনে,কিন্তু আমি সেই মুহূর্তে ওদের সাথে ঠিক সড়গড় ছিলাম না।যাই হোক,আলাপ জমতে ছেলেদের বেশীক্ষণ লাগে  না,বিশেষ করে জলপাইগুড়ির ছেলেদের অন্ততঃ! তাই আমরাও সবাই মিলে গেলাম মিনিটেই।সবাই মিলে ঠিক করলাম শহরটাকে দু-চার পাক দিয়ে ঢুকে যাব "তিস্তা"-য়।বেশী রাত আবার করা যাবে না।কারন তিস্তা আবার রাত ১০ টায় গেট বন্ধ করে দেয়,তবে আমাদের জন্য সেটা এক ঘন্টা পিছিয়ে যেত খুব দরকারে।
অতঃপর  বেরিয়ে পড়লাম।আমরা কদমতলা,গোমস্তাপাড়া,পাঁচ নাম্বার গুমটি,কালোডোবা, মাষকলাই বাড়ি,শান্তিপাড়া হয়ে যখন নতুন ব্রীজের কাছাকাছি (এখনকার বিশ্ব বাংলা ক্রীড়াঙ্গনের পাশের সেতু,যেটির মাধ্যমে গৌড়ীয় মঠের পাশের রাস্তা দিয়ে রায়কতপাড়ায় ওঠা যায়।আমরা কথ্য ভাষায় নতুন ব্রীজ বলতাম এবং এখনো বলি) পৌঁছেছি,তখন একে অন্যকে দেখতে পাচ্ছি না এত্ত ধোঁয়াসা!শুধু আমাদের নিজেদের বাইকের কমলা ইন্ডিকেটরের আলো আর টিমটিমে হেডলাইটের আভাস ছাড়া অন্য কিছু আর নেই রাস্তায়।আমরা সাবধানে শ্লথ গতিতে পৌঁছে গেলাম "তিস্তা"-য়।

যথারীতি আমাদের প্রিয় ভেজ ফ্রায়েড রাইস (তখন ৪০/- প্লেট ছিল) আর চিলি চিকেন (তখন ৮০/- প্লেট ছিল) সবাই মিলে ভাগ করে খেয়ে মৌরী চিবোতে চিবোতে যখন বাগানে এসে দাঁড়ালাম তখন ঘড়িতে বলছে রাত ১১-২০।সবার মনের অবস্থা জানতাম না,তবে আমি আর বিধান দারুন উৎফুল্ল।দুজনে মিলে ঠিক করলাম নতুন ব্রীজ অবধি আমরা পাকা রাস্তা দিয়ে যাবো না।তার পরিবর্তে পাশে সরু এবং জঘন্য কাঁচা রাস্তা দিয়ে স্পোর্টস কমপ্লেক্সের নির্মিয়মান স্টেডিয়ামের কঙ্কালের পেছন দিক দিয়ে বেরোবো।সেই জায়গাটা সব সময়েই,বিশেষ করে বিকেলের পর থেকে থাকতো একদম শুনশান এবং কোনো লাইটের ব্যবস্থা সেই এলাকাটিতে ছিল না।চারদিক ছিল বিষাক্ত পার্থেনিয়াম এবং  ঘন ঝোপ ঝাড়।সেই ঝোপ-ঝাড়ের উচ্চতা কিছু জায়গায় দু তিন মানুষ উঁচুও ছিল।আমি যদিও বিধানের কাছেই আগে শুনেছিলাম যে ওই এলাকাটি ভালো না,কিন্তু আমি একা এবং দু-একবার আমার দু-একজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সেখানে চক্কর দিয়েও গা শিউরোনো নির্জনতা আর একবার অশ্লীল অবস্থায় একটি ছেলে আর মেয়েকে ধরা ছাড়া আর কিছুই পাইনি।তাই বিধানের প্রস্তাবে আমার বেশ আনন্দই হল,কারন এসব ভৌতিক জায়গায় ঘোরার আলাদা আনন্দ থাকে।
সাথের অর্ণব আর মৈনাকের (নাম পরিবর্তিত)একটু আপত্তি ছিল।কিন্তু আমাদের কাছে সে আপত্তি ধোপে টিঁকলো না।সুতরাং ধীরে-ধীরে আমরা সেই রাস্তা দিয়েই ঢুকলাম।স্পোর্টস কমপ্লেক্সের আধা নির্মিত সেই বিশালকায় কঙ্কালের পেছনদিকে পৌঁছে বিধান বাইকের স্টার্ট বন্ধ করে দিল।আমিই ছিলাম ওর বাইকে।আমিও নামলাম কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করেই।অবচেতনেই একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ফেললাম।বিমান কোনোদিনও সিগারেট খেত না।আমি আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে মৈনাকদের দিকে বাড়িয়ে দিলাম।বিধান ততক্ষনে একটা ঝোপের কাছে গিয়ে ছোট কাজ শুরু করেছে।ওর দেখাদেখি অর্ণবও আরেকটু এগিয়ে আরেকটা বড় ঝোপের আড়ালে গিয়ে প্যান্টের জিপারটা খুললো।
কয়েক সেকেন্ড পর বিধান ফিরে এল।আমরাও বাইকের দিকে এগোচ্ছি,দেখি অর্ণব আসেনি।কি ব্যাপার? মনটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো অকারনেই।ফিরে দেখি অর্ণব একটু তফাতে বড় ঝোপটার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।ওর দাঁড়ানোটা কেমন যেন!
একটা অশ্রাব্য গালি দিয়ে ওকে ডাকলো বিধান।তাও দেখি নট নড়ন চড়ন।এবার আমার একটু টেনশন হয়ে গেল,চাপা স্বরে বিধানকে বললাম,"ব্যাপারটা ঠিক সুবিধের না ভাই,চল চল দেখি।"
আমরা তিনজনেই আস্তে আস্তে অর্ণবের পেছন দিক থেকে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।তারপর ওকে ধরে জম্পেশ ঝাঁকুনি দিলাম।

ও আস্তে করে ওর ডানহাতটা তুলে সামনের দিকে দেখালো।সবাই একবারে একসাথে সেদিকে তাকালাম।তাকিয়ে দেখি সামনের ঘন অন্ধকার ভেদ করে একটা হাল্কা,স্নিগ্ধ মায়াবী আলো মতো চক্রের মতো অতি ধীরে ধীর যেন কুন্ডলী পাকাচ্ছে মাটি থেকে ফুট খানেক ওপরে।ধীরে ধীরে সেই আলোটা একটা লম্বাটে আকার নিতে লাগলো।আমরা তখন বাকরুদ্ধ এবং পাথরের মতো স্থির।কি করবো না করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।শুধু চোখ-কান আর মগজটা কাজ করে চলেছে সক্রিয়ভাবে।সেই কয়েক সেকেন্ড ব্যাপারটা আমাদের মনে হয়েছিল কয়েক ঘন্টা ধরে চলেছিল।টের পাচ্ছিলাম আমার গলা শুকিয়ে আসছে,পা দুটো কেউ যেন কয়েক শো কেজি ওজন দিয়ে মাটির সাথে স্থির করে দিয়েছে।কোনো মন্ত্র-তন্ত্র-হনুমান চালিশা,মহা মৃত্যুঞ্জয় কিচ্ছু মনে ছিল না।এভাবে কতক্ষন কি চলেছিল কোনো সময়ের হিসেব ছিল না আমাদের।অন্তিম মুহূর্তে দেখলাম সেই নরম আলোটা ফুট ছয়েকের মত উঠে এক মানুষের অবয়ব নিচ্ছে,পা দুটো আর হাত দুটো সেই আলোর দলা থেকে আলাদা রুপ নিল।এমন মোক্ষম সময়েই বিধান ছুটে গিয়ে অর্ণবের হাত ধরে দিল এক হ্যাঁচকা টান আর একসাথে আমরা সবাই যেন সম্বিত ফিরে পেলাম।আমি চীৎকার করে সবাইকে বললাম কেউ যেন আর ওদিকে না তাকায়।সব্বাই দৌড়ে বাইকের কাছে চলে এলাম,কিন্তু বাইক আর স্টার্ট  হয় না,কি গেরো! এদিকে ভূতের ভয় আর ওদিকে কুয়াশায় বাইক ঠান্ডা মেরে গেছে,অবশ্য আমাদের হাত-পা-ও ঠিকঠাক কাজ করছিল না।মৈনাক তো কী-হোলই খুঁজে পাচ্ছিল না,থরথর করে কাঁপছিল ওর হাত! বিধান আর আমি গিয়ে ওকে সাহায্য করলাম আর তারস্বরে "রাম রাম" জপ করতে থাকলাম।অর্ণব সারা রাস্তায় আর একটিও কথা বলেনি। ওকে আর মৈনাককে ছেড়ে বিধান আর আমি আমার বাড়ির সামনে এলাম।আমার বাড়ি থেকে বিধানের বাড়ি দুটো গলি পরেই।অন্যান্য দিন হলে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়েও আমাদের কেটে যেত ঘন্টার পর ঘন্টা।কিন্তু সেদিন আর সেই ইচ্ছে বা শখ কোনোটাই ছিল না,তাই বিধান আমাকে নামিয়ে বেরিয়ে গেল ওর বাড়ির উদ্দেশ্যে।রাত তখন প্রায় ১-৩০।

পরের দিন দোকানে বিধান যখন এলো তখন বেলা প্রায় ১১-৩০ হবে।অন্যান্য দিনের মতো খোশ মেজাজ নেই দেখলাম।আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই জানালো,মৈনাক ফোন করেছিল ওকে।ভোর রাত থেকে অর্ণবের ধুম জ্বর। এমনকি রীতিমতো প্রলাপ বকছে।ওর বাড়ির থেকে নাকি সুমন্ত্রদার (ডাক্তার সুমন্ত্র মুখোপাধ্যায়) কাছে নিয়ে যাবে কিছুক্ষন বাদে। আমরা দুজনেই চিন্তিত হয়ে পড়লাম,একথা-সেকথার পর বিধান বিদায় নিল।
সেদিন বিকেলে বা রাতেও ও আর এলো না।আমিও নানান কাজে ভুলে রইলাম।রাতে বাড়ি ফেরার পর খাওয়া-দাওয়া সেরে টিভি-র সামনে বসলাম।তখনি মোবাইলটা বেজে উঠলো,স্ক্রীনে ভেসে উঠলো বিধানের নাম।রিসিভ করার পর শুনলাম সন্ধ্যা থেকে মৈনাকেরও প্রবল জ্বর।এবার একটু চিন্তার ব্যাপার হল।

পরের দিন সকাল ১১-৩০ নাগাদ আমি আর বিধান পর্যায়ক্রমে অর্ণব আর মৈনাকের বাড়ি গেলাম।দুজনেই দেখলাম মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত।কেউই বাড়িতে রাতের অভিজ্ঞতার কথা জানায়নি।
আমার আর বিধানের মনেও এই নিয়ে এক দুশ্চিন্তার উদয় হল।এভাবে মানসিক অশান্তি নিয়ে কেটে গেল দু-চার দিন।ওদিকে অর্ণব আর মৈনাকেরও অবস্থার কোনোরুপ আশাব্যঞ্জক  উন্নতি দেখা যাচ্ছিল না।আমি আর বিধানও নিজেদের নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম।কিন্তু ভগবানের কৃপায় আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের দুজনের কোনো উপসর্গ বা রোগ দেখা দেয়নি।অনেক দিন ভুগে ওরা দুজন একদিন সুস্থ হল।তারপর একদিন আমি আর বিধান ওদের দুজনকে নিয়ে গিয়ে হনুমানজীর মন্দিরে পূজো দিইয়ে নিয়ে আসি,আর আরেকদিন জমীরকাকুর বাড়ি থেকে (জমীরকাকুর বিষয়ে আমার "কালীপূজোর ভয়াল রাতে" অভিজ্ঞতায় বিশদে বলা আছে) ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।তারপর ওদের আর কোনো ভয়-ডর লাগেনি সেই ব্যাপারটা নিয়ে।ভবিষ্যতে আমি একা বহুবার রাতে ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেছি,দাঁড়িয়েছি।কিন্তু সেদিনের মতো সেই অভিজ্ঞতা আর কোনোদিনও হয়নি।এখন তো আর সেই জায়গা চেনাও যায় না।এখন সেখানে বিরাজ করছে "বিশ্ব বাংলা ক্রীড়াঙ্গন"।


© Anirban Banerjee

Comments

Popular posts from this blog

গুরুদেব।

রাজ।

শেষ লেখা।