দুর্গাপূজোর দোরগোড়ায়!

বিগত বেশ কিছু সপ্তাহ ধরে আমি শুধু আমার অভিজ্ঞতাই শুনিয়ে শুনিয়ে আপনাদের ধৈর্য্যচ্যূতি ঘটাচ্ছি,তাই ভাবলাম আজ একটু অন্যের অভিজ্ঞতার বর্ণনা শোনানো যাক।যদিও এই ঘটনার মধ্যে ভৌতিক উপাদান বা আকর কতোখানি আছে,সেটা নিয়ে আমি নিজেও কিছুটা অন্ধকারে,তবুও সেই বিচারের গুরুদায়িত্ব আজ আপনাদের ওপর বর্তালাম।এক্ষেত্রে আমি আগেই খুব জোর দিয়ে আরেকটি কথা নিজের দায়িত্ব নিয়ে বলে রাখছি।ভূত বলুন বা অশরীরি, আমাদের ছোটবেলার বা বড়বেলার গল্পে শোনা বা পড়া বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা জেনেছি যে,ওনারা আলো সহ্য করতে পারেন না!এমনকি,আমার জন্মের আগেও আমার বাবা যখন রীতিমতো প্রেতচর্চা করতেন,সেই ঘটনাগুলোও অনেক বড় হওয়ার পরে যখন বাবার কাছ থেকে অনেক কষ্টে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শোনার চেষ্টা করতাম,বাবাও কিন্তু এই একই কথা আমাকে বলে গেছেন।আবার আমি আমার এক অভিজ্ঞতায় হিমালয়ের যে মহান যোগীর উল্লেখ করেছিলাম,যাঁর সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আছে (আমাদের প্রাক্তণ এক রাষ্ট্রপতির তিনি ভাই),তিনি কিন্তু আবার ওঁনার এক ঘটনায় আমাকে প্রখর রোদের মাঝেও দিনের পর দিন প্রেতাত্মার কর্মকান্ডের কথা শুনিয়েছেন।এমনকি ঝুমুরের ঘটনা,বা দোমহনীর ঘটনা বা কালীপূজোর সেই রাতের ঘটনা,যেগুলো আমার জীবনে ঘটেছিল,(একমাত্র স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পেছনের সেই ঘটনাটা ছাড়া),সব ক্ষেত্রেই কিন্তু আলোর একটা ভূমিকা ছিলোই।যাই হোক,আমার এই ঘটনা কিন্তু আঁধারে আত্মার তত্ত্বই আজ প্রমাণ করবে।

এটা খুব সম্ভবতঃ ২০১৪ সালের ঘটনা।আমি আগেও বলেছিলাম আমি আমার পাড়ার বারোয়ারী পূজোর সাথে চিরকাল যুক্ত থাকি।তো এই ঘটনাটা সেই সময়কার দুর্গাপূজোর সময় ঘটেছিল।আমি ২০০৬ সাল থেকেই,অর্থাৎ আমার কম্পিউটার ব্যবসার শুরুর সময় থেকেই জলপাইগুড়ি গভর্ণমেন্ট ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের সব হোষ্টেলে কম্পিউটার পেরিফেরালস সাপ্লাই দিতাম এবং ওরাও বেশীর ভাগ স্টুডেন্টস ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ আমার থেকেই কিনতো,যদিও তখন ল্যাপটপ এতোটা বিক্রি হত না হোষ্টেলে।এরকম একদিন আমি দোকানে থাকাকালীন দু-চারজন স্টুডেন্ট এসেছিল কুখ্যাত চার নাম্বার হোষ্টেল থেকে।দরদাম ঠিক হয়ে যাওয়ার পর ওরা অগ্রিম দিয়ে চলে যায় এবং কথা হয় পরের দিন অর্থাৎ মহাষষ্ঠীর দিন সকালে ওরা ল্যাপটপটা ডেলিভারি নিয়ে বাড়ি রওনা হবে।যদ্দুর মনে পড়ছে ওরা মেদিনীপুরের ছিল।ওরা চলে যাওয়ার পর আমি নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশান জানিয়ে শিলিগুড়ির আমার মহাজনকে ফোন করে দিই এবং উনি বলেন যে এক ঘন্টার মধ্যে উনি বাসে আমার মাল লাগিয়ে দিচ্ছেন।এভাবেই সুপারে বাসের ড্রাইভার বা কন্ডাকটারের তত্ত্বাবধানে আমাদের "মাল" বা লাখ-লাখ টাকার কম্পিউটার সামগ্রী পাঠানো হত এবং বাস স্ট্যান্ড থেকে বিরাজ দা এবং তার টীম হাত ঠ্যালা করে বা ভ্যান রিক্সায় সেসব আমাদের দোকানে পৌঁছে দিতেন।তখন ট্রান্সপোর্ট মারফত জলপাইগুড়িতে এসব পাঠানোর এত সুবিধে ছিল না।
এসব ঝামেলা মিটিয়ে আমি দুপুরে বাড়িতে খেতে চলে আসি।খাওয়া দাওয়ার পর বাঙালীর দুর্নাম রক্ষা করে,ভাতঘুম দিয়ে বিকেল নাগাদ আবার দোকান যাই।একটু পর থেকেই শুরু হয়ে গেল ফোনের উৎপাত।"দাদা কখন আসবো?" এই কথার উত্তর দেওয়াটা তখন ছিল বাড়ির অর্ধাঙ্গিনীর সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার থেকেও বেশী বিব্রতকর এবং বিভ্রান্তিকর।মিষ্টি কথায় কাষ্টমারকে ভুলিয়ে টাইম কিল করা যে কতোখানি দূরুহ তা বোধ করি সব ব্যবসায়ীরাই হাড়ে হাড়ে টের পান! আমিও আমার গঁত বাঁধা উত্তরে সাময়িক ঠেকিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের মিউনিস্যাপিলিটি মার্কেটের জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি সুপার বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে।সেসময় নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল রাস্তার বীভৎস জ্যাম,সুপার আর মিনি বাসের গন্ডগোল আর কথায় কথায় বাস স্ট্রাইক ইত্যাদি।আমি গিয়ে কুলী ঠেকে খোঁজ নিয়ে জানলাম আমার কোনো "মাল" নাকি আসেনি।শুনে মাথাটা গেল গরম হয়ে! ওখানে দাঁড়িয়েই ফোন করলাম মহাজনকে,সেও ফোন ধরে না।অনেকক্ষন চেষ্টা করে আমি দোকানে ফিরে এলাম।
এই বদভ্যাসটাও তখনকার ওই মারোয়ারী মহাজনদের ছিল।ফোন করলেই দুটো লব্জ ছিল বাঁধা।এক- পইসা ডালা? আর দুই-স্টাফ নেহি হ্যায়,আনে কে বাদ মাল লাগা দেতা হুঁ এক ঘন্টে মে। তো আমিও বুঝলাম আমি ওই দ্বিতীয় কোটায় পড়েছি,ল্যান্ডলাইন,মোবাইল সব জায়গায় ফোন করি,ব্যাটা ফোন ধরে না।লাস্টে ওই দোকানের মুনিমকে ফোন করলাম।ইনি কিন্তু হিন্দী সিনেমার "জীবন"-এর মত মুনিম নন,ইনি ছিলেন বিদুরের মত স্পষ্টবক্তা।ইনি জানালেন,মাল ক্যাইসে দেগা আপকো? মাল নেহি হ্যায় ঘরমে।আভি দুসরে দুকানসে লায়েগা,ফিন আপকো ভেজেগা"।
শুনে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ।বলে কি? এদিকে কুখ্যাত চার নাম্বারের মুহুর্মুহু ফোন,এদিকে রাত নয়টা বেজে যাচ্ছে,এদিকে কখন কোথা থেকে ল্যাপটপ আনবে,সেই ল্যাপটপ কিভাবে পাঠাবে কারন লাস্ট বাস চলে গেলে তো আর আজ ল্যাপটপ পাবো না,আবার পরদিন সকালেই ওদের রোড স্টেশান থেকে ট্রেন।
এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আল্টিমেটলি সেটাই হল।রাত সাড়ে ন'টা বেজে গেল,ল্যাপটপও এল না।চার নম্বরের চারজন এসে আমাকে ঘিরে রইলো,আমি মনে মনে বাবা লোকনাথকে ডাকছি আর ভাবছি রণে,বনে,জলে,জঙ্গলে তো রক্ষা করো,কম্পিউটারের দোকানে এসে কি রক্ষা করবে? এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সেই মুনিমের ফোন এল।উনি জানালেন,উনি ময়নাগুড়ি বাড়ি ফিরছেন ম্যাটাডোরে মাল নিয়ে।ফেরার সময়ে গোশালা মোড়ে উনি আমাকে মাল ডেলিভারি দেবেন।উফফ,হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
ওদের বুঝিয়ে বললামআমি ল্যাপটপ ওদের হোস্টেলে রাতেই পৌঁছে দিয়ে আসবো।আমার আশ্বাসে এবং ফোনালাপে ওরা তুষ্ট হয়ে ফিরে গেল এবং আমিও বাড়ি ফিরলাম রাত দশটা নাগাদ।

বাবা যতোদিন আমাদের সাথে ছিলেন,আমার চিরকাল একটা ইচ্ছে ছিল বাবাকে মন ভরে,বাবার ইচ্ছে মত খাওয়ানোর।কারন ছোট থেকে দেখতাম বাবা খেতে এবং খাওয়াতে দারুন ভালোবাসতেন।কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর থেকেই বাবা প্রচন্ড সংযমী হয়ে যান।তবুও আমি আপ্রাণ চেষ্টা করতাম আমার পুরোনো বাবাটাকে ফেরত আনবার।বিশেষ করে পূজোর সময়গুলোয় আমি আর আমার স্ত্রী জোর করে বাবাকে সেই খোলস থেকে বের করে আনতাম।
আমি মনে মনে ভেবেই রেখেছিলাম পূজোর এই কয়দিন বাড়িতে রান্নার ব্যবস্থাই রাখবো না।কিন্তু বাবার অনুমতি ব্যতিরেকে সেটা সম্ভবও ছিল না। আমি ভাবলাম গোশালা থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে ওদের পৌঁছে দিয়ে চাঁদনী চক থেকে রাতের খাবার নিয়ে একবারে বাড়ি ফিরবো।সেই অনুযায়ী বাবাকে বলাতে বাবা গাঁইগুঁই করে রাজী হলেন বোনলেস চিলি চিকেন আর ভেজ ফ্রায়েড রাইস খেতে।এমন সময় মুনিমজীও ফোন করলেন এবং জানালেন,উনি মোহিতনগর পৌঁছে গেছেন,আমি যেন গোশালায় পৌঁছে যাই।আমিও সেইমত সেখানে পৌঁছে,ল্যাপটপ নিয়ে,ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে গিয়ে  ডেলিভারি দিয়ে,চাঁদনী চক থেকে খাবার নিয়ে বাড়ি ফেরার সময়ে পাড়ার মোড়ে আটক হলাম।
রাত তখন প্রায় পৌনে বারোটা।দেখি জনা দশেক ঢাকী তৈরী,গাড়িও তৈরী এবং ক্লাবের সব সভ্যরাও  তৈরী।স্টেশান রোডের নরেন পালের কারখানা থেকে মায়ের প্রতিমা আনা হবে।খাবারের এবং বাবার খাওয়ার বাহানা দিয়ে পরিত্রাণ পেয়ে বাড়ি ঢুকলাম।

বাড়ি ফিরে বাবাকে সবার আগে খেতে দিয়ে তিনজনে খাবার টেবিলে বসে সারাদিনের গল্পগুলো বলছিলাম।বাবার সাথে সারাজীবন,বিশেষ করে মা মারা যাওয়ার পর থেকেই একটা বিরাট দূরত্ব আমার ছিল,কিন্তু আমার বিয়ের পর আমার স্ত্রীয়ের সাথে বাবার বন্ধুত্ব দেখে বাবার ওপর আমার মারাত্মক রাগও হত আবার স্ত্রীয়ের ওপর হিংসেও হত।এসব গল্পগাছা চলতে চলতে কিছুক্ষন বাদে টের পেলাম ঢাকের শব্দ ফিরে আসছে।বুঝলাম আমাদের মা আসছেন।আমার স্ত্রী এসব ব্যাপারে দারুন উৎসাহী।বাবাও সাথে-সাথে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন,তুমি বাইরে যাও,ঠাকুর আনছে,দেখো গিয়ে।
ও তো দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আমাদের গেটে গিয়ে দাঁড়ালো।আমাদের মেইন গেটের একটু পাশেই এত ঘন গাছ যে মাথা নীচু করে ঢুকতে হয়,তাই আলো বা বৃষ্টির জল কোনোটাই ঠিকঠাক পড়ে না।ও সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আর বাবার খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়াতে আমিও একটু বাদেই ওর দিকেই এগোচ্ছি।দেখি ও কার সাথে যেন কথা বলছে একা একাই।আমি আরো উৎসাহী হয়ে আরেকটু এগিয়ে গেলাম ওর পেছন দিক দিয়ে।শুনলাম ও বলছে,"এবার প্যান্ডেলটা আগের থেকে ভালো হয়েছে,বলো"।
আমি পুরো অবাক হয়ে ভাবছি,আমি যে ওর পেছনে ও সেটা জানে না,আর বাবার খাওয়া হয়ে গেছে সেটাও ও জানে না।তার চাইতে বড় কথা, আমি আসার সময়েই দেখলাম ও কারো সাথে আগের থেকেই কথা বলছে।ব্যাপারটা কি?
হঠাৎ দেখি ওর ডান পাশের মাটিতে একটা ঘন পূর্ণবয়ষ্ক মানুষের ছায়া।আমি আমার পাশে তাকিয়ে দেখলাম আমার অস্পষ্ট ছায়া আমার সাথেই।আমার স্ত্রীয়েরটাও ওর বাঁপাশে পড়েছে।তবে এই তৃতীয় ছায়াটা কার?
ছায়াটা দেখছি নড়ছে,আবার দুহাত দোলাচ্ছে!আমার স্ত্রীয়ের কথায় এদিক-ওদিক ঘাড় হেলাচ্ছে! আমার শরীর দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।আমি ওকে ডাকবো না কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।এমন স ময় ঢাকের আওয়াজ প্রখর হল।"দুর্গা মাইকী জ্যয়" চীৎকারে বুঝলাম মা এসে গেছেন আমাদের পাড়ায়।আবার চোখ গেল,দেখি অবয়ব নেই,শুধু গোল মাথাটার ছায়াটা!আমার স্ত্রীয়ের চোখ তখন পাড়ার মোড়ের ট্রাকের দিকে( আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ মিটার দূর)।ট্রাক তখন মোড় ঘুরছে,মায়ের পিঠ আমাদের দিকে,আমার চোখ মাটির দিকে,মাথার ছায়া একবার আমার স্ত্রীর ডানদিকে যাচ্ছে আবার সাঁৎ করে বাঁদিকে যাচ্ছে। এবার ট্রাক ঘুরছে,মায়ের মুখ এবার একদম আমাদের মুখোমুখি।আমার চোখ মায়ের মুখের দিকে,আবার মাটির দিকে,মুন্ডুর ছায়া চোখের সামনে ড্রপ খাওয়া বলের মতো ওপরে উঠে গাছের সাথে মিলিয়ে গেল।আমার চোখ এবার আমার স্ত্রীয়ের দিকে।সে তখন দুহাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে মাকে প্রণাম করছে আর বলছে,"দুগগা দুগগা!"

সেবারই পূজো মিটে যাওয়ার পর একদিন দুপুরে খাওয়ার টেবিলে আমি পুরো ঘটনাটা উত্থাপন করি। প্রথম রিএ্যাকশান আমার স্ত্রীই দিল।প্রথমে নির্বাক তারপরে চরমতম সবাক! বাবা চিরকালের অভ্যেসমতো প্রথমে চুপ,তারপরে আরো বেশী চুপ।আমি অনেক কষ্টে এটুকু বুঝলাম,আমার স্ত্রী ভেবেছিল আমি বাবাকে বলে বাইরে বেরিয়ে ওর পাশেই এসে দাঁড়িয়েছিলাম,কারন কেউ যে ওর পাশে ছিল,স্বভাবতই ও সেটা ফিল করছিল আর আমি ছাড়া আর কেই বা হতে পারে,তাই ও আর পাশে তাকায়নি,আর ছায়াটা তো আমি নিজেই দেখেছিলাম।
এই ঘটনার পর থেকে পরের প্রতি বছর (বাবা চলে যাওয়ার পর দু-বছর বাদ দিয়ে) ও আমার সাথে,আমাকে বগলদাবা করে মায়ের প্রতিমা আনতে যায়।

© Anirban Banerjee

Comments

Popular posts from this blog

গুরুদেব।

রাজ।

শেষ লেখা।