ঝুমুরের অভিজ্ঞতা।
আমার নাম অনির্বাণ ব্যানার্জী।আমি জলপাইগুড়িতে থাকি।ছোট্ট থেকেই দেখে এসেছি আমার বাবা এবং বাড়ি সম্পর্কে জলপাইগুড়ি এবং জলপাইগুড়ির বাইরেরও বহু লোক,যারা অবশ্যই আমাদের পরিচিত,তারা অনেক কিছুই জানেন যা সাধারণ জানা এবং বোধ বুদ্ধির বাইরে।ভারতের এবং বাংলার অনেক বিখ্যাত মনিষীদের সাথে বাবার ছিল জানাশোনা এবং হার্দিক সম্পর্ক। বোধ হওয়া অবধি দেখে এসেছি আমাদের বাড়িতে বহু বিখ্যাত তান্ত্রিকদের উপস্থিতি এবং সেসব ক্ষেত্রে আমার উপস্থিতিতে সব সময়েই নিষেধাজ্ঞা ছিল,শুধু সারারাত ব্যাপী আলোচনা এবং রোমাঞ্চকর সব অভিজ্ঞতা শোনার ছাড় ছিল,যেগুলো শোনার জন্য আমি সেইসব ব্যক্তিদের আসবার অপেক্ষায় দিনের পর দিন হাঁ করে থাকতাম।আমি জলপাইগুড়ির এমনও অনেক স্বনামধন্য ডাক্তার এবং ব্যক্তিদের চিনি,যাঁরা দিনের পর দিন আমাদের বাড়িতে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন এবং অনেক সময় সেই ডাক্তারদের পাওয়ার জন্য আমাদের বাড়ির বাইরেও রোগীদের লম্বা লাইন পড়ে যেত।প্রসঙ্গতঃ আমার বাবাও স্বাস্থ দপ্তরেই চাকরী করতেন এবং বাবার ১৬ বছর বয়েস থেকেই বাবা এসব অতিপ্রাকৃতবাদ এবং বনৌষধি নিয়ে পাগল ছিলেন এবং সারা জীবনে বাবার নিজেরই মোট ১০-১১ জন গুরু ছিলেন।বাবা আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে ছিলেন শৈব দীক্ষায় দীক্ষিত।বনৌষধির ক্ষেত্রে বাবার বন্ধু ছিলেন "চিরঞ্জীব বনৌষধি" খ্যাত প্রখ্যাত শ্রী শিবকালী ভট্টাচার্য্য মহাশয়।
এছাড়া আমাদের বাড়িতে এমন কোনো বনৌষধি ছিল না,যা পাওয়া যেত না।সেসব যোগাড়ের জন্য দেশ এবং দেশের বাইরে থেকেও বহুবার বহু মানুষ এসেছেন বাবার কাছে,বহু মানুষের এবং গুণী মানুষের সান্নিধ্যে আসার সুবর্ণ সুযোগ এসেছে আমার কাছেও।বাবা মারা গেছেন ২০১৭ সালের ৩১ শে ডিসেম্বার রাত ১২.০২ মিনিটে,বা বলা উচিত ১ লা জানুয়ারী,২০১৮ সালে।আমৃত্যু কোনোদিনও কারো কোনো কাজের জন্য কারো কাছ থেকে এক নয়া পয়সাও নেননি তিনি।আমিই মাঝে মাঝে রেগে গিয়ে বা ইয়ারকি মেরে বলতাম,"বাবা,নিজের টাকা খরচ করে লোকের উপকার করে কি লাভ?? সে তো উপকার পেয়ে আর তোমাকে জানায়ও না,তোমাকে উল্টে ফোন করে খোঁজ নিতে হয়।এর থেকে বাকীদের মত তুমিও টাকা নাও,তাহলে বাড়িটারও সুরাহা হবে,প্রাচীর দেওয়া দরকার।১২ কাঠা জমি,এত গাছ-গাছালি,একটা মন্দিরও করা যেত লোকনাথ বাবা আর শিবের।দোতলাও হয়ে যেত এতদিনে।আর তুমি তো নিজের পকেটের টাকা খরচ করে মাইলের পর মাইল হেঁটে এসব খুঁজে বেড়াও,আমার বাইকেও যেতে চাও না।কি লাভ??"
বাবা বেশীরভাগ সময়েই হেসে উড়িয়ে দিতেন,আর সব সময়েই বলতেন,টাকা নিলে আর নিজের প্রচার করলে দ্রব্যগুণ নষ্ট হয়ে যায়।আবার অনেক সময়ে আমার ওপরে বিরক্তও হতেন,তবে বাবার প্রচন্ডরকম ধৈর্য ছিল।একবার নিজেই কোনো শেকড় কাটতে গিয়ে এককোপে নিজের বাঁ-হাতের আঙুল অর্ধেক কেটে ফেলেও কাউকে কিছু বলেননি,চুপচাপ ছিলেন।
অন্যের উপকার করে এক অসাধারণ আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন,সেটাই ছিল তাঁর পারিশ্রমিক।বাবা চিরকাল চাইতেন আমি যেন এসব ব্যাপারে না জড়াই।সেজন্য জলপাইগুড়ির অনেক গুপ্ত তান্ত্রিক,যাঁরা বাবার বন্ধুস্থানীয় এবং অনুজ,তাঁরা বহুবার আমার গোপন অনুরোধে এবং তৈলমর্দনের পরে বাবার থেকে মত নিতে পারেননি আমাকে কিছু শেখাবার জন্য।আমাদের জলপাইগুড়ির পশ্চিম কংগ্রেস পাড়া সার্ফ মোড়ের এখনো অনেককে আমি বলে দিতে পারি যাঁরা কুকুরের কামড় খেয়ে এবং গলায় মাছের কাঁটা বিঁধে দিনের পর দিন আমাদের বাড়িতে যখন তখন এসে হাজির হতেন।মাছের কাঁটার উপাচার তখনি হয়ে যেত।এমনকি শিলিগুড়ি,কলকাতার আত্মীয়রাও ল্যান্ডলাইনে ফোন করে সেই উপচার নিতেন।বাবা নিজের গলায় হাত বুলিয়েই সেটা করে দিতে পারতেন।আর কুকুরের কামড়ের জন্য ছিল কাঁসার থালা আর লবণ পড়া।
কুকুরের কামড়ে বিষ থাকলে সেই থালা চুম্বকের মতো গিয়ে আটকে ধরতো রোগী বা রোগীনির পিঠে।যতক্ষণ বিষ না ছাড়বে,থালাও সেঁটে থাকবে।বিষ না থাকলে থালা ধরবেই না। আমি নিজে দেখেছি দু-দিন ধরে একজনের পিঠে থালা সেঁটে থাকতে,তার বাড়ি আমাদের দেশবন্ধুনগর কলোনীর পঞ্চায়েত পুকুরের পাশে।আর থালার পরের ধাপ ছিল লবণ পড়া।যেই রঙের কুকুর কামড়াতো,সেই কুকুরের লোম পাওয়া যেত ওই লবণে।বাবা বলে দিতেন দুই কি তিনদিন ভালোমতো বেছে সেই লবণটা খাওয়ার সাথে খেতে।এরকম হাজার ঘটনা আমি এবং অনেক প্রবীণ জলপাইগুড়িবাসীই হয়তো আমার বাবার সম্পর্কে জানেন।
মা সারাজীবন এইসবের কোনো কিছুই পছন্দ করতেন না।কারন মা-র ধারণা ছিল,এবং আরো অনেকেই বলতেন এসব তন্ত্র-মন্ত্র এবং এসব দিয়ে লোকের উপকার করলে তার খেসারত নিজের পরিবারকে দিতে হয়।এবং সেসব মনে করার যথাযোগ্য কারণও মায়ের ছিল,সেই ব্যাপারে অন্য আরেক দিন বলা যাবে।তবে ১৯৯৭ সালে মায়ের মৃত্যুর পরে এসব থেকে বাবার একটু পিছিয়ে আসার থেকে আমার ধারণা,বাবাও হয়তো তবে এই ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছিলেন।আর ২০০৮ সালে আমার বিয়ের পর থেকেই আমার স্ত্রীয়ের সাথেও ঘটতে থাকে একের পর এক দূর্ঘটনা এবং সে নিজে প্রত্যক্ষ করতে থেকে একের পর এক ভৌতিক তথা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলী।যাই হোক,এতক্ষণের এই গৌড়চন্দ্রিকার কারনহল,আমার আর আমার স্ত্রীয়ের জীবনের একদম ছোট ছোট কিন্তু সর্বৈব সত্যি ঘটনা আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরা।
জীবনে কোনোদিন ছড়া আর প্রবন্ধ বাদে কিছুই লিখিনি,তাই এসব পড়ে পাঠক কতোটা রসাস্বাদন করতে পারবেন বা আদৌ পারবেন কিনা,জানিনা।সেক্ষত্রে অগ্রিম মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি।
এই মুহুর্তেই প্রথম যে ঘটনাটা মনে পড়ছে সেটা ঘটেছিল খুব সম্ভবতঃ ১৯৯৮ সালে।আমি তখন জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে ফনীন্দ্রদেব স্কুলে কমার্স নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছি।মা মারা গেছেন এক বছর আগে।আমরা তিন বন্ধু ছিলাম অভিন্ন হৃদয়।আমি,সঞ্জয় নন্দী (বুবাই) এবং শান্তনুব্রত ঘোষ (বাবন)। বুবাইদের একটি মিষ্টির দোকান আছে সার্ফ মোড়ে।বুবাইয়ের কাকা ছিলেন বিশ্বজিৎ নন্দী( উনিও আজ আর নেই)। তো সেই বিশ্বজিতকাকু কিনেছিলেন একটি বক্সার বাইক।আর আমাদের মধ্যে তখন কেবল বুবাইই পারতো বাইক চালাতে।
কালীপূজোর সময় ছিল।পুরো জলপাইগুড়ি আলোকমালায় সজ্জিত।চিরকালই কালীপূজোয় ডুয়ার্সের নাম বাংলাসেরা।আর সেই সময়েও ময়নাগুড়ি আর ধূপগুড়ির পূজো ছিল চোখ ধাঁধানো।প্রতিবার তাই ভাইফোঁটার পরদিন সব বন্ধুরা মিলে চাঁদা তুলে আমাদের পাড়ারই এক কাকু স্বপন চক্রবর্তীর এ্যাম্বাসেডার নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম ময়নাগুড়ি-ধূপগুড়ির ঠাকুর দেখতে।রাতে খড়ের ছাউনি দেওয়া চাঁদনী চকে রুটি-তড়কা খেয়ে ঠাকুর দেখতে যাওয়া।ফিরতে ফিরতে পরদিন ভোর ৫ টা।তো যাই হোক,সেবার কোনো কারনে বা আমাদের নিজেদের মধ্যে মতান্তর হওয়ায় গাড়ী নিয়ে আর ঘুরতে যাওয়া হয়নি।আমিও ম্রিয়মান হয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে শুয়েছিলাম ঘরে।বাবা পাশের ঘরে ঘুমে।আর আমাদের ঘরের সব দরজা আলাদা,মানে সব ঘর দিয়ে আলাদা ভাবে বাইরে বেরোনো যায়,অন্য ঘরে ঢুকতে হয় না।আর আমার আর বাবার ঘরের পার্টিশনের দরজাও আমি লক করে শুতাম।তার প্রধান কারন ছিল সদ্য শেখা ধূমপানের নেশা।সেদিন তখন প্রায় ১২ টা বাজে রাত।হঠাৎ শুনি জানালায় টোকার আওয়াজ।টোকার আওয়াজটা বেশ পোড়খাওয়া।শুনেই বুঝলাম এটা কোনো গোপন অভিসন্ধির সংকেত।আমিও তাই সন্তর্পণেই জানালাটা ফাঁকা করলাম।দেখি,বুবাই আর বাবন দাঁড়িয়ে।অনেক কষ্টে ও বিশ্বজিৎকাকুর বাইকটা যোগাড় করেছে শহরে ঘোরার নাম করে।
ওদের প্ল্যান হল ময়নাগুড়ি আর ধূপগুড়ি যাবে,আবার ভোর হওয়ার আগে ফিরেও আসতে হবে,কারন বাইকটা মুছে আবার গ্যারেজ করতে হবে।আর সব চাইতে বড় কথা বাবা ওঠার আগে,অর্থাৎ ভোর ৫ টার মধ্যে আমাকেও গ্যারেজ হতে হবে।তাই,বুক ঢিপঢিপ নিয়ে,কোনোভাবে একটা প্যারাশুট কাপড়ের উইন্ড চীটার জড়িয়ে,দরজা ভেতর থেকে লক করে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের বাড়ি থেকে সার্ফ মোড় প্রায় ৩০ মিটার হবে,সেই অবধি বাইক হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে কিক মারা হল।ব্যস,শুরু হল আমাদের পূজা পরিক্রমা।
ময়নাগুড়িতে বুড়ীছোঁয়া সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ধূপগুড়ির উদ্দেশ্যে।খুব সম্ভবতঃ সেই সময়ে "ব্লুজ ফিলটার" সদ্য লঞ্চ করেছিল।সেই সিগারেট ছিল আমার খুব প্রিয়,আর বাকী দুজন কস্মিনকালেও সিগারেট কিনে খেয়েছে কিনা সন্দেহ।সেই সিগারেটের ধোঁয়া আর এক্সেলেটর দাবানোর ফলে কেৎরে ওঠা বক্সারের ধোঁয়া তখন মিলে-মিশে একাকার।বাইক ছুটছে ৮০-১০০ তে।আর রাস্তা?? সে তো কহতব্য ছিল না।কোনোরকমে ঠাকুর দেখা শেষ করে আমরা ফিরতি পথে রওনা যখন দিই,তখন ঘড়িতে প্রায় সাড়ে তিনটে হবে বোধ হয়।ঠান্ডায় আর হাওয়ায় তিন জনেই জড়োসড়ো। বুবাই বাইক চালাচ্ছে,মাঝখানে আমি আর বাবন পেছনে।
রাস্তায় বিরাট বিরাট গাড্ডা।আর নিকষ অন্ধকার।বাইকের টিমটিমে আলো ছাড়া আর কোনো আলোর অস্তিত্ব নেই মনে হচ্ছে পৃথিবীতে।বুবাই হঠাৎ বললো আমরা যে জায়গাটা পার হতে চলেছি তার নাম ঝুমুর।আর সেখানে একটা শ্মশান আছে।জায়গাটা ভালো না।শুনে আমি আর বাবন একদম চুপ করে গেলাম।আমি বুবাইকে বললাম চুপচাপ চালাতে থাক,সেসব নিয়ে ভাবিস না।ভগবানের আশীর্বাদক্রমে এবং ছোটবেলার থেকে ভূত-প্রেত এসব আলোচনা শুনতে-শুনতে সত্যিই আমি শিহরিত হলেও সেই অর্থে ভয় খুব একটা পেতাম না।তখনো আমার পৈতে হয়নি,গায়ত্রী মন্ত্রও জানতাম না।তাও ওদের সাহস দিলাম,ওরাও আমাদের বাড়ির এবং অবশ্যই আমার বাবার সব কীর্তি-কাহিনী জানতো,তাই ওরাও একটু-আধটু বিশ্বাস করতো হয়তো আমাকে।আর মা মারা যাওয়ার পর থেকেই আমি বাড়ির বাইরে বেরোলেই গা বন্ধন করেই বেরোতাম।সেই অভ্যেস আমার অদ্যবধি রয়ে গেছে।যাই হোক,বুবাই একথা বলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হঠাৎ ঘটে গেল এক আজব ঘটনা।
আমাদের বাইক তখন ছুটছে কম করে ৯০ থেকে ৯৫ কিলোমিটার গতিতে।হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে আমার বাঁ-দিকে উপস্থিত হলেন গায়ে গামছা জড়ানো,লুঙ্গি পরা,টাক মাথা,কালো-রোগা এক বৃদ্ধ।তার চোখে-মুখে অজস্র বলিরেখা!আর এক হাতে একটি কালিপড়া হ্যারিকেন,সেই হ্যারিকেনটি নিজের কানের পাশে উঁচিয়ে ধরে উনি খুব সম্ভবতঃ আমাদের দেখার চেষ্টা করছেন।আমরা তিন জনেই একসাথে বোবার মত বাঁদিকে সেই বৃদ্ধের দিকে পাথরবৎ তাকিয়ে থাকি।কতোক্ষন,সেই খেয়াল আজও পড়ে না।তবে এটুকু মনে আছে,আমরা জলঢাকা সেতু পার হয়ে যাওয়ার পর অবধি সেভাবেই ছিলাম,একই গতিতে।এবং সেই মূর্তিও সম গতিতে আমাদের পাশেই এসেছিল,ধরুন পাশাপাশি দুটি গাড়ি একই গতিতে গেলে যেরকম হয়,ঠিক সেরকম।অনেক পরে আমরা সম্বিৎ ফিরে পাই।পরের দিন বাধ্য হয়ে আমি বাবার কাছে সব খুলে বলি,কিন্তু তার কোনো প্রতিকার বাবা দেননি বা প্রয়োজন পড়েনি।পরে বহুবার বহু মানুষের কাছে শুনেছি জায়গাটা নাকি খারাপ।এবং আজও আমাদের ঘরোয়া আড্ডায় ঘুরে-ফিরে আসে ঝুমুরের প্রসঙ্গ।
আরো অনেক ঘটনা আছে।কিন্তু লেখার অভ্যেস আমার নেই,তাই মূল ঘটনার থেকে অপ্রয়োজনীয় কথাই অনেক বেশী বলে ফেললাম হয়তো,যারা পড়বেন,মার্জনা করে দেবেন।
Comments
Post a Comment