কালীপূজোর ভয়াল রাতে

প্রথমেই আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।কারন আমার জীবনের *ঝুমুরের অভিজ্ঞতা* পড়ে আপনারা এত মতামত দিয়েছেন এবং অন্যান্য অভিজ্ঞতাগুলো লেখার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন,আমি সত্যিই এতোটা আশা করিনি।আগের অভিজ্ঞতায় আমি আমার বাড়ি এবং বাবার কার্যকলাপ সম্পর্কে একটু ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম যাতে আমি ভবিষ্যতে আবার আমার জীবনের কোনো অস্বাভাবিক বা অশরীরি ঘটনার কথা লিখলে আর নতুন করে সব কিছুর পুনরাবৃত্তি না করতে হয়।সেই কারনেই এই ঘটনাটা,যা এখন আমি লিখতে চলেছি,সেখানে আর সেসব ব্যাপারে আলোকপাত করছি না।এই ঘটনাটার সময়কাল ১৯৯৯ সাল।তখন স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে আমি স্থানীয় আনন্দচন্দ্র কলেজে "ট্যাক্স প্র‍্যাক্টিস এন্ড প্রোসিডিওর" নিয়ে গ্র‍্যাচুয়েশন করছি।পিঠের দুটো পাখনাই  দিন-রাত বনবন করে ঘুরে চলেছে।স্কুলের কূয়ো ছেড়ে তখন আমি কলেজের মহাসাগরেরর ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে দিব্যি আছি।নতুন নতুন প্রেম,ছাত্র পরিষদের হুমকি,কলেজ ক্যাম্পাসে ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ানশিপ,নিজস্ব লবিবাজি এসব নিয়ে বিন্দাস চড়ে বেড়াচ্ছি।বাইরে শীতের হাওয়া বইলেও মনের ভেতর সদাই বসন্ত।
সেই সময়ে আমাদের পাড়ার,মানে পশ্চিম কংগ্রেস পাড়া সার্ফ মোড়ের সার্ব্বজনীন কালীপূজোর ভার ছিল আমাদের হাতে।মানে আমাদের গ্রুপে আমরা যারা ছিলাম,যেমন আমি,সঞ্জয় (বুবাই),শান্তনু (বাবন),কৌশিক (বুম্বা),সুব্রত (কম্পো),অসীম,যীশু,প্রিয়ঙ্কর (বাপ্টু) ইত্যাদি।সেসব কারনেও আমাদের পায়া যথেষ্ট ভারী হয়েছিল সেই সময়।

সেদিন ছিল কালীপূজোর রাত।আর আমাদের এদিকে সেই সময়ে এখনকার মতো কালীপূজোর দু-দিন আগে প্রতিমা এনে উদ্বোধন করা হত না।আর আমাদের পাড়ার পূজোও তখন এত বড় আর জাঁকজমকপূর্ণ হতোও না।সেই সময়ে রাত ৯ টা অবধি চাঁদা কেটে এসে ঠ্যালাগাড়ি নিয়ে আমরা জনা চার-পাঁচেক সভ্য যেতাম প্রতিমা আনতে।রাত ১০ টা থেকে ১০-৩০ মিনিট নাগাদ পুরোহিত স্বপনবাবু আসতেন,পূজো চলতো ভোর ৫ টা অব্ধি প্রায়,তারপরে ধোঁয়া ওঠা ভোগের খিচুড়ি পুরোনো খবরের কাগজে খেয়ে যে যার বাড়ি ফিরতাম সাময়িক।পূজোর সময়ে অবশ্য পাড়ার এবং ক্লাবের সিনিয়ার দাদারা কিছু উপস্থিত থাকতেন।

তো সেবার কালীপূজোর দিন দুয়েক আগে থেকেই টের পেলাম বাড়ীতে কিছু একটা ঘটতে চলেছে।আমার বাবা ছিলেন প্রচন্ড রাসভারী এবং বাবা যতোদিন জীবিত ছিলেন,আমার সাথেও কোনোদিনই বাবার সেরকম সখ্যতা গড়ে ওঠেনি,আসলে সেই সুযোগটাও বাবা কোনোদিন আমাকে দেননি এবং আমার তরফ থেকেও হয়তো আমি সেই চেষ্টায় খামতি রেখেছিলাম অজ্ঞাতেই।
আমার সমস্ত বন্ধু-বান্ধবরাও বাবাকে বেশ সমঝেই চলতো।এমনকি বাবার বন্ধু-বান্ধবের সাথেও নিজস্ব গন্ডীর বাইরেও অন্যান্য যেকোনো বন্ধু-বান্ধবের সাথে একটি বৃত্ত সব সময়ের জন্য রক্ষিত করে চলতেন।তবে বাবার খুব কাছের ছিলেন জয়ন্তীপাড়ার সুশীল পাল,সুশীলকাকু এবং গৌরীকাকিমা আমার এবং আমাদের পরিবারেও খুব কাছের ছিলেন।দুঃখের বিষয় ওঁনারা কেউই আজ আর ইহলোকে নেই।


তো যাই হোক,সেই কারনেই বাবার কীর্তি কাহিনী বা বাড়িতে কিছু ঘটতে চললে বা কারো আসবার কথা থাকলেও সেই বিষয়ে আগাম কিছু জানা বা বোঝার ক্ষমতা বা অধিকার আমার ছিল না।আর বাবাকে জিজ্ঞেস করলেও তার উত্তর মেলা ছিলো লটারীতে প্রথম পুরষ্কার পাওয়ার মতো ব্যাপার।বাবা এমনিতেই প্রচন্ড আত্মভোলা ছিলেন এবং জাগতিক সব কিছুর ব্যাপারেই ছিল অদ্ভুত এক নিষ্পৃহতা।এমনকি ১৯৯৭ সালে জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে মা যখন মারা যান,তার পর মুহুর্তেই বাবাকে দেখেছে সবাই হাসপাতাল কম্পাউন্ডের বাইরে তৎকালীন ওয়ার্ড মাষ্টার মিলনকাকুর কোয়ার্টারে ঔষধি গাছ খুঁজতে।সাথে ছিলেন ডাঃশিবাশীষ চক্রবর্তী কাকু।আবার অনেক সময় রাস্তা-ঘাটে,শহরে বাবাকে দেখে  "বাবা,বাবা" করে ডাকার পরেও বাবা আমার দিকে উদাসীনভাবে এবং নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে না চেনার মতো পাশ কাটিয়ে কোনো উত্তর না দিয়েই চলে গেছেন এবং আশে-পাশের পথ চলতি লোকজন আমার দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন,এমন নজিরও প্রচুর।
সেই কারনেই বাড়ির কোন জাগতিক ব্যাপারেও আমি ছিলাম সম্পূর্ণ উপেক্ষিত এক বস্তু।এবং সেই কারনেই উৎসাহের এবং উৎকন্ঠার পারদ ছিল আকাশছোঁয়া।বাবার এবং বাবার থেকেও আমার বেশী কাছের আরেকজন মানুষ ছিলেন বাদলকাকু।পুরো নাম বাদল বসাক।ওঁনার একটা ছোট্ট রুপোর কারখানা ছিল কদমতলা মোড়ে,রয়্যাল রেষ্টুর‍্যান্টের ঠিক পাশের দোকানটাই।পরে ব্যবসা বদল করে কাকু ওটাকে তেলেভাজার দোকান করেন।বাবাদের সান্ধ্য আড্ডা বেশ কিছু বছর ওখানে ছিল।কাকুর বড় ছেলে মনা এখনো সেই দোকান চালায়।কাকিমা বাড়িতে সব চপ-কাটলেট বানিয়ে দিতেন আর কাকু সেগুলোই দোকানে বিক্রি করতেন,ধর্মপ্রাণা কাকিমার হাতের রান্নার সাথে সাথে অন্যান্য আধ্যাত্মিক পড়াশোনাও আছে।
সেই বাদলকাকু ছিলেন আমার তুরুপের তাস।কাকুও খুব আস্কারা দিতেন আমাকে,ভালোও বাসতেন খুব।কাকুদের বাড়িও আমাদের বাড়ির একদম সামনেই।অগত্যা রাতে একদিন কাকু বাড়ি ফেরার পথে চড়াও হলাম।সেও কিছু বলতেই চায় না।অনেক ধানাই পানাই করে শেষমেশ কথা বের হলো।শুনে তো আমি আহ্লাদে আটখানা।

শুনলাম,কালীপূজোর রাত্রে আমাদের পুরোনো বাড়িতে বসবে এক মহাযজ্ঞের আসর।এখানে দুটো কথা একটু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।প্রথমতঃ যজ্ঞ মানে হোম নয় কিন্তু,আমি একটি বড় কর্মকান্ড বোঝাতে চাইছি।আর দ্বিতীয়তঃ পুরোনো বাড়ির ব্যাপারটা একটু স্পষ্ট করে দিই।আগের লেখায় আমি জানিয়েছিলাম আমাদের বাড়িটি মোট ১২ কাঠা জমির ওপরে।আমাদের বাড়িটি ছিল জমিটির শেষ প্রান্তে।বাঁশের মোটা বেড়ার ওপরে বালিজাতীয় জিনিষ দিয়ে প্লাষ্টার করা দেওয়াল ছিল।আমাদের মেঝে ছিল পাকা আর বাকী তিনটে ঘরের মেঝেই ছিল কাঁচা।ইংরাজী "এল" অক্ষরের মত ছিল বাড়ির প্যাটার্ন। মাঝখানে ছিল মস্ত উঠোন,তার উল্টোপাশে বড় মাটির রান্নাঘর,পাশেই কুয়ো।ঠাকুমার কাছে শুনতাম আমাদের কুয়োয় নাকি ঝরণা আছে,তাই আজন্ম কোনোদিন কোনো সময়ে সেই কূয়োর জলস্তর নামেনি,কোনোদিন কূয়ো ছেঁকাতেও হয়নি।তার পাশে ছিল ছোট্ট একটি পুকুর,আর চারপাশে ছিল আম,গোলাপজাম,কালোজাম,খেজুর,বাতাপিলেবু,নারকেল,সুপারী,কাঁঠাল,লাল জামরুল,সাদা জামরুল,ফলসা,আঙুর,বিলিতি গাব,সবেদা,বুনোজাম,লটকা,কামরাঙা,পেয়ারা,পীচ,আমলকী,জলপাই,লেবু,করমচা,পানিয়াল,রোয়াল,বনকাঁঠাল,বেল  ইত্যাদি রকমারি গাছ।এর বেশীর ভাগ এখনো রয়ে গেছে আমাদের বাড়িতে এবং সুস্বাদু ফল দিয়ে চলেছে।এছাড়া গোটা বাড়িতে ভরে ছিল লক্ষ-লক্ষ বনৌষধি যা সারাজীবন ধরে বাবা সংগৃহীত করেছিলেন।ক্লাস নাইনে থাকাকালীন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুতের কানেকশন আসে এবং আস্তে আস্তে আমরা পুরোনো বাড়ি ছেড়ে ওই জমির সামনের দিকে বানানো আমাদের অধুনা বাড়িটিতে চলে আসি।ওই বাড়ির দু-একটি ঘরে তখন চলতো আমাদের সারারাত ব্যাপী ক্যারাম পেটানো,কল ব্রে খেলা আর লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া।

সেই বাড়ির একটি ঘর বাবার শেষ মুহুর্তের পাওয়া আদেশে আমি আর বাপ্টু সারাদিন খেটে ভদ্রস্থ করে দিলাম।সারা মেঝে খুঁজে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ খুঁজে বের করাটাই ছিল সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ।ক্যারাম বের করে বাইরে রাখা হল।তারপর বাবার আদেশ এল সেইদিন থেকে কালীপূজোর পরের দিন অবধি আমরা কেউই যেন ওই চত্বর না মাড়াই।স্বভাবতই আমার উদ্দেশ্য ছিল তখন যেন-তেন-প্রকারেণ মূল কর্মযজ্ঞের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা।আমি আর বাপ্টু অনেক চেষ্টা করেও কোনো কিছু উদ্ধার করতে পারলাম না।যাই হোক,কপাল ঠুকে দিন-রাত তক্কে তক্কে থাকতে লাগলাম।

কালীপূজোর দিন বিকেলে প্রথম আমাদের বাড়িতে এলেন পান্ডাপাড়া কাঠের ব্রীজের নিবাসী,বাবার খুব একনিষ্ঠ জমীরউদ্দীন কাকু।জমীরকাকুকে দেখে কিছুটা আশার আলো দেখলাম।কারন জমীরকাকুকে হুমকি দিয়ে আমি দু-একবার দু-তিনখানি জিনিষ শিখেছিলাম,বাবা অবশ্য সে খবর জানতেন না।জমীরকাকুর কাছ থেকে পাওয়া গেল আসল খবর।শুনলাম রাতে জিন নামানো হবে,ভবিষ্যতের কোনো এক কর্মপন্থার ব্যাপারেই নাকি এই উদ্যোগ।শুনে সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো,সাথে অদ্ভুত এক অপার্থিব উত্তেজনা আর আনন্দ! সারাদিন ঘুরঘুর করে খেয়াল করলাম রাতের কর্মকান্ডের প্রস্তুতি।হরেক কিসিমের দ্রব্যাদির বিচরণ ঘটতে লাগলো সেই ঘরে।
নানাবিধ ধূপ,লোবান,হরেক কিসিমের মিষ্টি,আরো ঢাকা দেওয়া সব রেকাবিতে নাম না জানা জিনিষের আগমন ঘটতে লাগলো সেই ঘরে।শ্বেত শুভ্র চাদর বিছানো হল।ঘরের ১০০ ওয়াটের ক্যারাম খেলার বাল্ব পাল্টে লাগানো হল কম পাওয়ারের মিহি আলোর কোনো বাল্ব।খাওয়া দাওয়ার ব্যাপার কিছুই বুঝলাম না।জমীরকাকু শুধু দুধ খেলেন দুপুরে।বাবা নিরামিষ।খাওয়ার পাতে শেষ ফরমান জারি হল,সন্ধ্যা ৭ টার পরে পুরোনো বাড়ির চত্বরেই আমার এবং আমার সব বন্ধুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।কারন তাইতে প্রাণ নাশের আশংকাও থাকতে পারে।

সন্ধ্যে নাগাদ বাড়ীতে এলেন বাদলকাকু।বুঝলাম ইনিও শিকে ছিঁড়েছেন কোনোভাবে।তারপর দেখি আমাদের সার্ফের মোড়ের ভৌমিক হার্ডওয়্যারের মনুদা! ওকে দেখে তো আমি খুব খেপে গেছিলাম।প্রচন্ড রাগ হয়েছিল বাবার ওপরে।নিজের ছেলে থাকতে কিনা মনুদা এই মিশনে চান্স নিয়ে নিল?? সেটা আমি কোনোভাবেই মানতে পারছিলাম না।তবু কি আর করা যাবে,নিজের ভাগ্যকে দূষছিলাম আর রাতের প্রতীক্ষা করছিলাম।সন্ধ্যা ৬-৩০ মিনিট নাগাদ বাবা,জমীরকাকু,বাদলকাকু আর মনুদা চলে গেল আমাদের পুরোনো বাড়িতে।আমিও বন্ধুদের সাথে চাঁদা কাটতে বেরিয়ে গেলাম।তারপরে ঠাকুর এনে,সব গুছিয়ে বাড়ি ফিরলাম প্রায় রাত ১১ নাগাদ।রান্না কাম কাজের মাসী (উনি আমাদের বাড়িতেই থাকতেন) খেতে দেওয়ার সময়ে শুনলাম বাবারা রাতে কিছু খাবেন না ঘরে এবং ওঁরা কেউই আর এদিকে আসেন নি।
খেয়ে দেয়ে আবার ক্লাবে গেলাম।বন্ধুরা এল।স্বপনবাবু এলেন,পূজোয় বসলেন।আমি আর বাপ্টু শুধু এপাশ-ওপাশ ঘুরেই যাচ্ছি।একবার বাপ্টুকে বললাম বাড়িতে চল তো একবার।
ও কোনোভাবেই রাজী হয় না।আমিও নাছোড়বান্দা। শেষে অনেক কষ্টে নিমরাজী করালাম।আমি আর ও অন্ধকারেই পা টিপে টিপে পুরোনো বাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম।নিজের হৃদপিন্ডের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম।বাপ্টু দুই-একবার হাত ধরে টানার বৃথা চেষ্টা করেছিল।আমার তরফ থেকে কোনো সদর্থক সাড়া না মেলায় ও-ও বাধ্য হয়ে সাথেই পা মেলালো।ঠিক ঘরের বাইরে পৌঁছে শুনি ভেতরে গমগম আওয়াজ হচ্ছে।লোবানের ধোঁয়া আর হাল্কা আলোর ছটা বেরিয়ে আসছে বেড়ার ফাঁক দিয়ে।কস্তুরী আর আরো নানাবিধ সুগন্ধে চারদিক ম- ম করছে।আর ধৈর্য্য রাখতে পারলাম না।খুব সাবধানে একটা পুরোনো কাটা নারকেল গাছের গুঁড়ির ওপরে উঠে চোখ লাগালাম বেড়ার দেওয়ালের ফুটোয়।
দেখি ঘর শুভ্র মোলায়েম আলো আর সুগন্ধীর ধোঁয়ায় ঘোলাটে হয়ে আছে।ওঁরা তিনজন সমান্তরাল ভাবে বসে আছেন হাঁটু গেড়ে বজ্রাসনে আর জমীরকাকু আলাদা একটু আগে বজ্রাসনে বসে (ঠিক ত্রিভূজের মতো)। জমীরকাকু অনবরতঃ তাঁর হাত দুখানা নিজের হাঁটুর থেকে উরুর দিকে মালিশের মতো করে ডলছে আর সুরা জিন পড়ছে।সবার চোখ বন্ধ।সে এক অদ্ভুত আধিভৌতিক পরিবেশ।কতক্ষন এভাবে তাকিয়েছিলাম নিজেই ঠাহর করতে পারছিলাম না।বাপ্টুকে জিজ্ঞেস করাতে ও এসব দেখতে চাইলো না।আমরা আবার রাস্তায় ফিরে এলাম।

মনটা খচখচ করতে লাগলো।বারবার মনে হতে লাগলো আমি বোধ হয় ভুল করলাম।বারবার ভাবতে লাগলাম বাবার নিষেধ অমান্য করে না গেলেই বোধ হয় ভালো হত।ভয় পেতে লাগলাম আমি ওদের সাধনা দেখে ফেলাতে ওদের কোনো ক্ষতি হবে কিনা সেই আশঙ্কায়!কারন আমি শুনেছিলাম জিন খুব ভয়ংকর হয়,আগুন থেকে সৃষ্ট হয় জিন এবং তাঁদের প্রভূত ক্ষমতা থাকে।যাই হোক,এসব ভাবতে ভাবতে আমি বাপ্টুকেও আশংকার কথা জানালাম।ও নিজেও সংশয়ে ছিল।আমি আর ও আমাদের বাড়ির পাশেই দিলীপ চৌধুরীর (মার্চেন্ট রোডের মা লক্ষী হার্ডওয়্যার আর মা লক্ষী ভ্যারাইটিস) বাড়ির বেল গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে দুটো সিগারেট ধরালাম।রাত তখন দুটো-আড়াইটা হবে।
অনতিদূরে মোড়ে সবাইকে দেখতে পাচ্ছি।পূজোর অস্পষ্ট মন্ত্রোচ্চারণও শুনতে পাচ্ছি।মনটা দুজনেরই পূজোর দিকে চলে গেল।হঠাৎ একটা উগ্র গন্ধে দুজনেরই চটকা ভাঙলো।উগ্র আতরের গন্ধ! পুরো নাক জ্বলিয়ে দেওয়া।আমার কোনোকালেই আতরের গন্ধ খুব একটা পছন্দ নয়।তাই আমার নাকে গন্ধটা মনে হয় আরো উগ্র লাগলো।আমি আর বাপ্টু চমকে উঠে দুজন দুজনের দিকে তাকালাম।
দেখি আমাদের পেছন থেকে এক ব্যক্তি পুরো আমাদের অগ্রাহ্য করে আমার আর বাপ্টুর মাঝখান দিয়ে গলে বেরিয়ে গেল।কেউ কিচ্ছু টের পেলাম না,কারো গায়ের সাথে ছোঁয়াও লাগলো না।ভদ্রলোকের উচ্চতা ফুট চার সাড়ে চার হবে।সাধারণ ফুল শার্ট,ফুল প্যান্ট পরা।আমি আর বাপ্টু কিংকর্তব্যবিমূঢ়!ভদ্রলোক আমাদের থেক বড়জোর কুড়ি পা গিয়েই হাপিস!আর আমরা দুজন হাঁ।কেউ কাউকে কিছু বলতেই পারছি না,শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি।
আমাদের ঘোর কাটার আগেই দেখছি সেই ভদ্রলোকটিই,ওই একই জামা-কাপড় পরা, হনহন করে আমাদের উল্টো দিক থেকে,মানে পূজো প্যান্ডেলের দিক থেকে এসে আমাদের বাড়ির গেট খুলে আমাদের বাড়িতে ঢুকছে।আমি চীৎকার করে আওয়াজ দিয়েই এগিয়ে এলাম।বাপ্টুও আমার সাথে।ভদ্রলোক আমার থেকে তখন ১৫-২০ মিটার দূরে।স টান তাকালেন স্থির দৃষ্টিতে আমাদের দিকে।স্পষ্ট দেখলাম সরু গোঁফ,গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারা,নির্লিপ্ত ভাবলেশহীন মুখ।
একবার যেন নিমেষের জন্য চোখদুটোয় আগুন জ্বলে উঠলো।ঠিক রাত-বেরাতে অন্ধকারে বেড়ালের চোখে আলো ফেললে যেমন লাগে,ঠিক তেমন।আমরাও সম্মোহিতের মতো এগিয়ে গেলাম ওঁনার দিকে।গেটের কাছে আসতেই দেখি সব ভোঁ ভাঁ। আবার সেই একই ব্যাপার।কেউ নেই।তবে ম-ম করছে সেই একই উগ্র আতরের গ ন্ধ।আরো অদ্ভুত ব্যাপার হল।বারান্দায় বেরিয়ে এলো বাবা,জমীরকাকু,বাদলকাকু আর মনুদা।বাবা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন কলিং বেল কে বাজালো কারন আমি আর বাপ্টু দুজনেই তখনো গেটের বাইরে।সম্বিত ফেরার পর ঘরে ঢুকলাম।ঘটনাদুটো খুলে বললাম।সব শুনে জমীরকাকু জানালেন ওঁদের সাধনা অসম্পূর্ণ হয়েছে,ওঁদের অভীষ্ট সিদ্ধ হয়নি কোনো কারনে, সব ঠিক থাকা সত্ত্বেও।কিন্তু জিন এসেছিল।জিন এলে তাঁরা নাকি প্রমান দিয়ে যান।তাই কলিং বেল বাজিয়ে জানান দিয়ে গেছে।
কিন্তু আমাদের কেন দেখা দিয়ে গেল সেটার সদুত্তর কেউই দিতে পারলেন না।কিন্তু ভয়ের বা সংশয়ের থেকে বেশী তখন আমি অপরাধবোধে ভুগছি।বারবার মনে হচ্ছিল কেন আমি লুকিয়ে ওঁদের কান্ডকারখানা দেখতে গেলাম।কেন বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও মানলাম না বাবার আপত্তি।সেই আক্ষেপ আমার এখনো যায়নি,আর এই অপরাধের কথা বাবাকে জানাতে পারিনি কোনোদিনও।আজও সেদিনের সেই অপরাধবোধ যন্ত্রণা দেয়।

© Anirban Banerjee

Comments

Popular posts from this blog

গুরুদেব।

রাজ।

শেষ লেখা।